
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার সিংগা নদীর ওপর নির্মাণাধীন ৬০ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি সেতুর কাজ আট বছরেও শেষ হয়নি। এক বছরের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা থাকলেও বারবার সময় বাড়ানোর পরও কাজের অগ্রগতি ৪৫ থেকে ৬০ শতাংশের বেশি হয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের প্রায় দেড় লাখ মানুষ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, খর্ণিয়া ইউনিয়নের টিপনা এলাকায় সিংগা নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণের দাবিতে প্রায় ৩৬ বছর ধরে আন্দোলন ও দাবি জানিয়ে আসছিলেন নদীর দুই তীরের টিপনা, সিংগাসহ আশপাশের গ্রামের বাসিন্দারা। তাদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালে সরকার সেতু নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করে।
উপজেলা প্রকৌশল কার্যালয় (এলজিইডি) সূত্র জানায়, ৬০ মিটার দৈর্ঘ্যের সেতুটি নির্মাণে প্রাথমিক ও সংশোধিত বরাদ্দ মিলিয়ে ব্যয় ধরা হয় ৭ কোটি ১৮ লাখ টাকা। ২০১৮ সালের ৬ ডিসেম্বর ‘আকন ট্রেডিং’ ও ‘মাহফুজ খান (জেভি)’ নামের দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে কাজের কার্যাদেশ পায়। ২০১৯ সালের ১২ ডিসেম্বর কাজ শেষ করার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা সম্ভব হয়নি।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি এবং মাঝপথে মূল ঠিকাদারের মৃত্যুর কারণে প্রকল্পটি আইনি ও কারিগরি জটিলতায় পড়ে। গত দুই থেকে আড়াই বছর ধরে নির্মাণকাজ প্রায় বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ থাকায় প্রকল্প এলাকায় স্তূপ করে রাখা রডসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এদিকে সেতুর কাজ বন্ধ থাকায় দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এলাকাবাসীর নিজস্ব অর্থায়নে সেতুর পূর্ব পাশে বাঁশ ও কাঠের তক্তা দিয়ে একটি অস্থায়ী সাঁকো তৈরি করা হয়েছে। ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন ওই সাঁকো ব্যবহার করে পারাপার করতে হচ্ছে মানুষকে।
সিংগা গ্রামের বাসিন্দারা জানান, এলাকায় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মন্দির রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে অস্থায়ী সাঁকো ডুবে গেলে ডিঙ্গি নৌকাই একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠে। এতে স্কুলগামী শিশুদের ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হতে হয়। জরুরি রোগী ও গর্ভবতী নারীদের হাসপাতালে নেওয়াও তখন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
স্থানীয় বাসিন্দা নিছার আলী সরদার, শিবপদ গাইন ও অনিমেষ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “৩৬ বছরের অপেক্ষার পর সেতুর বরাদ্দ পেলেও ঠিকাদারের গাফিলতি ও প্রশাসনিক উদাসীনতার কারণে আমরা আজও সুফল পাচ্ছি না। প্রতিদিন সন্তানদের স্কুলে পাঠিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। দ্রুত সেতুর কাজ শেষ করে আমাদের দুর্ভোগের অবসান করা হোক।”
খর্ণিয়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মোল্লা আবুল কাশেম বলেন, “সেতুটি ছিল এলাকার মানুষের স্বপ্ন। কিন্তু আট বছর ধরে অর্ধসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে থাকায় সেটি এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। বর্ষা এলেই অস্থায়ী সাঁকো ডুবে যায়, যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। দ্রুত কাজ শেষ করা জরুরি।”
ডুমুরিয়া উপজেলা প্রকৌশলী দারুল হুদা বলেন, “মূল ঠিকাদারের মৃত্যুর কারণে আইনি ও কারিগরি জটিলতায় কাজ বন্ধ হয়ে যায়। তবে সিসি ও পিসি গার্ডারসহ সেতুর প্রধান কাঠামোর কাজ অনেকটাই সম্পন্ন হয়েছে। বাকি কাজ শেষ করতে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। দ্রুত কাজ পুনরায় শুরু করে জনদুর্ভোগ কমানোর চেষ্টা চলছে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিজ সবিতা সরকার বলেন, “সেতুটি জনগুরুত্বপূর্ণ। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের আইনি জটিলতা নিরসন করে দ্রুত কাজ শুরু করতে উপজেলা প্রশাসন এলজিইডির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় করছে।”
খুলনা জেলা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম সরদার বলেন, “জনদুর্ভোগ লাঘবে প্রকল্পটি দ্রুত সচল করার লক্ষ্যে আইনি ও প্রশাসনিক বিষয়গুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। দ্রুতই ইতিবাচক সমাধান পাওয়া যাবে বলে আশা করছি।”