
যশোরের মনিরামপুরে মুক্তেশ্বরী নদী থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় রঞ্জন মণ্ডল (৬০) নামে এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় নতুন মোড় নিয়েছে তদন্ত। এ ঘটনায় সন্দেহভাজন পল্লিচিকিৎসক মিঠুন ধর এবং তাঁকে পালাতে সহযোগিতার অভিযোগে আব্দুল হান্নান গাজী নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
ভারতে পালানোর উদ্দেশ্যে সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টাকালে সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার ভাদালিয়া সীমান্ত এলাকা থেকে তাঁদের আটক করা হয়। গ্রেপ্তার মিঠুন ধরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করেছে পুলিশ।
গত ৭ নভেম্বর শনিবার সকালে মনিরামপুর উপজেলার মশিয়াহাটীর হেলারঘাট এলাকায় মুক্তেশ্বরী নদীতে বস্তাবন্দি অবস্থায় রঞ্জন মণ্ডলের মরদেহ ভেসে ওঠে। তিনি কেশবপুর উপজেলার সুফলাকাটি ইউনিয়নের কালিচরণপুর গ্রামের বাসিন্দা। পেশায় ঘের ব্যবসায়ী রঞ্জন মণ্ডলের বাবার নাম মৃত হরিপদ মণ্ডল।
নদীতে বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। ঘটনাটিকে সম্ভাব্য হত্যাকাণ্ড হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে শুরু হয় তদন্ত। জেলা পুলিশ সুপার ও জেলা প্রশাসকের নির্দেশনায় বিশেষ দল গঠন করে ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ শুরু করা হয়।
তদন্তের একপর্যায়ে নিহত রঞ্জন মণ্ডলের সর্বশেষ অবস্থান ও তাঁর সঙ্গে কারা যোগাযোগ করেছিলেন, তা অনুসন্ধান করতে গিয়ে স্থানীয় বাজারের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, মৃত্যুর আগে রঞ্জন মণ্ডল পল্লিচিকিৎসক মিঠুন ধরের চেম্বারে গিয়েছিলেন। এরপর তাঁকে আর নিজ এলাকায় ফিরে আসতে দেখা যায়নি।
এ সূত্র ধরে মিঠুন ধরের চেম্বার ও বাড়িতে খোঁজ চালান তদন্তকারীরা। তবে কোথাও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর মোবাইল ফোনও বন্ধ পাওয়া যায়। পরে প্রযুক্তিনির্ভর অনুসন্ধান ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তাঁর সম্ভাব্য অবস্থান শনাক্ত করা হয়।
পুলিশের অনুসন্ধানে জানা যায়, মিঠুন ধর সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার ভাদালিয়া সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। এ তথ্যের ভিত্তিতে স্থানীয় পুলিশের সহায়তায় সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালানো হয়। অভিযানে মিঠুন ধরকে আটক করা হয়। একই সঙ্গে তাঁকে পালাতে সহযোগিতা করার অভিযোগে আব্দুল হান্নান গাজীকেও গ্রেপ্তার করা হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নিহত রঞ্জন মণ্ডলের সঙ্গে মিঠুন ধরের আগে থেকেই পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা ছিল। তাঁদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ও চলাফেরাও ছিল। এই সম্পর্কের আড়ালে কোনো আর্থিক লেনদেন, বিরোধ কিংবা অন্য কোনো স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। তবে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
গ্রেপ্তার মিঠুন ধরকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডে তাঁর সংশ্লিষ্টতা, ঘটনার পূর্বাপর পরিস্থিতি এবং কীভাবে মরদেহ বস্তাবন্দি করে নদীতে ফেলা হয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানার চেষ্টা করছে পুলিশ। এ জন্য তাঁকে আদালতে হাজির করে পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে।
এ হত্যাকাণ্ডে আরও কেউ জড়িত ছিল কি না, হত্যার পরিকল্পনা কোথায় ও কীভাবে করা হয়েছিল এবং মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়ার ঘটনায় কারা ভূমিকা রেখেছিল, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা।
দুজন গ্রেপ্তারের পরও রঞ্জন মণ্ডলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও কৌতূহল রয়েছে। এখন পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ, প্রযুক্তিগত অনুসন্ধান ও অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণের মাধ্যমে চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের পুরো রহস্য উন্মোচিত হয় কি না, সেদিকেই তাকিয়ে এলাকাবাসী।