
মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, চিহ্নিত মাদক কারবারিদের গ্রেপ্তার এবং অপরাধ দমনে ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই আলোচনায় এসেছেন চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রাকিবুল ইসলাম।
থানায় যোগদানের মাত্র ৪৩ দিনের মধ্যে মাদক কারবারি ও অপরাধী চক্রের সদস্যদের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযান পরিচালনা করে স্থানীয়দের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তিনি। মাদকবিরোধী অভিযানে তাঁর কঠোর অবস্থানের কারণে স্থানীয়দের অনেকে তাঁকে ‘ফাটাকেষ্ট’ বলেও অভিহিত করছেন।
দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বলে পরিচিত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার এবং মাদক সরবরাহকারী চক্রের বিরুদ্ধে পুলিশের তৎপরতায় আলমডাঙ্গার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। বিশেষ করে মাদকসেবীদের পাশাপাশি মাদক ব্যবসায়ী, সরবরাহকারী ও সিন্ডিকেটের সদস্যদের লক্ষ্য করে অভিযান পরিচালনা করায় পুলিশের এই উদ্যোগ গুরুত্ব পাচ্ছে।
থানা পুলিশের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত ৪৩ দিনে আলমডাঙ্গা থানায় মোট ২১টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে হত্যা মামলা ৩টি, অস্ত্র মামলা ১টি, নারী ও শিশু নির্যাতন (অপহরণ) মামলা ১টি, চুরি ২টি, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে ১০টি, অন্যান্য অপরাধে ৩টি এবং জুয়া-সংক্রান্ত মামলা রয়েছে ১টি।
পুলিশের দাবি, এই সময়ে তিনটি হত্যা মামলার রহস্য উদ্ঘাটন করে তিনজন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে দায়ের করা ১০টি মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৪০ জনকে। এ ছাড়া অনলাইন জুয়া-সংক্রান্ত মামলায় তিনজন, নারী ও শিশু নির্যাতন (অপহরণ) মামলায় একজন এবং চুরি মামলায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অপহরণ মামলায় ভুক্তভোগীকেও উদ্ধার করা হয়েছে। চুরি মামলায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে একটি পাখিভ্যান ও একটি বাইসাইকেল উদ্ধার করা হয়। অন্যান্য মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে আরও তিনজনকে।
মাদকবিরোধী অভিযানে গ্রেপ্তার ৪০ জনের কাছ থেকে ৭৫ পিস ইয়াবা ও ৪৯০টি ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। অন্যদিকে, অস্ত্র মামলায় একজনকে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি একটি চাপাতি, একটি কুড়াল, দুটি ছুরি, দুটি ছোড়া ও একটি লোহার রড উদ্ধার করা হয়েছে।
নিয়মিত মামলার পাশাপাশি সংক্ষিপ্ত বিচার কার্যক্রমেও তৎপরতা দেখিয়েছে থানা পুলিশ। সামারি ট্রায়ালের মাধ্যমে ৩৫টি মামলায় ৪৫ জন আসামিকে সংক্ষিপ্ত বিচার আদালতের মাধ্যমে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। এসব অভিযানে ৪৭ পিস ট্যাপেন্টাডল, ৩২ গ্রাম গাঁজা, ১৩ পিস ইয়াবা, একটি পাখিভ্যান ও পাঁচটি মেহগনি গাছের তক্তা উদ্ধার করা হয়।
স্থানীয় সচেতন মহলের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ওসি রাকিবুল ইসলামের কর্মকাণ্ডের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে চিহ্নিত ও শীর্ষ মাদক কারবারিদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি। তাঁদের মতে, মাদক নির্মূলে শুধু মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই চলবে না। মাদকের উৎস, সরবরাহব্যবস্থা এবং ব্যবসার নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালী চক্রকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
তাঁরা মনে করেন, মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক প্রভাব কিংবা ব্যক্তিগত সুপারিশ যেন কোনো বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। অপরাধীর পরিচয়ের পরিবর্তে অপরাধের বিষয়টিই আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রাধান্য পাওয়া উচিত।
এ বিষয়ে ওসি রাকিবুল ইসলাম বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের অবস্থান জিরো টলারেন্স। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের সুপারিশ বা প্রভাব বিবেচনা করা হবে না। মাদক কারবারি যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, অপরাধে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
আলমডাঙ্গার সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, মাদকের ভয়াল বিস্তার রোধে পুলিশের এই তৎপরতা অব্যাহত থাকবে। বিশেষ করে তরুণ সমাজকে মাদকের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করতে মাদক ব্যবসার মূল হোতা, সরবরাহকারী এবং নেপথ্যের সিন্ডিকেট সদস্যদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের প্রকৃত সাফল্য কেবল গ্রেপ্তারের সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। মাদকের সরবরাহ ও বিস্তার কমানো, অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধ এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে এসব অভিযানের চূড়ান্ত সাফল্যের মাপকাঠি।
যোগদানের ৪৩ দিনে ওসি রাকিবুল ইসলামের নেতৃত্বে যে তৎপরতা দেখা গেছে, তার ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে আলমডাঙ্গাকে মাদকমুক্ত ও নিরাপদ জনপদ হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যাশা আরও জোরালো হবে।