
বাংলা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উৎসব হলো দূর্গা পূজা। ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত এই মহোৎসবের প্রতিটি দিনেই রয়েছে বিশেষ তাৎপর্য ও বিশেষ পূজার্চনা। এর মধ্যে মহানবমী হলো দূর্গোৎসবের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। নবমীর দিনে দেবী দুর্গাকে মহাশক্তিরূপে পূজা করা হয়, যিনি দানব নিধনে বিশ্ব রক্ষার প্রতীক।
মহানবমী শব্দটি এসেছে “মহা” অর্থাৎ মহান এবং “নবমী” অর্থাৎ নবম তিথি থেকে। নবমীর দিনেই দেবী দুর্গা মহিষাসুরের সঙ্গে ভয়ংকর যুদ্ধের চূড়ান্ত রূপ ধারণ করেন। পুরাণ মতে, নবমী তিথিতেই দেবী চণ্ডিকা মহিষাসুরকে বধের জন্য সর্বশক্তি নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হন।
বাংলা ক্যালেন্ডার অনুসারে, আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের নবমী তিথিতেই এই পূজা পালিত হয়। সাধারণত সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত নবমী পূজা চলে। অনেক জায়গায় নবমীর পূজা অষ্টমীর অন্তর্গত হয়ে সন্ধ্যা বা রাত পর্যন্ত গড়ায়। কিছু ক্ষেত্রে নবমী ও অষ্টমী একত্রে পালিত হয়, যাকে “মহাষ্টমী-নবমী” বলা হয়।
পুরাণ মতে, নবমীর দিনেই দেবী দুর্গা মহিষাসুরকে চূড়ান্তভাবে বধ করার জন্য প্রস্তুত হন। অষ্টমী ও নবমীর পূজা মূলত এই যুদ্ধের দিনগুলির প্রতীকী রূপ। নবমী তাই “বিজয়ের আগমনী বার্তা” বহন করে।
দূর্গা পূজার নবমী দিনটি ভক্তদের কাছে পরম ভক্তি ও আনন্দের উৎসব। এই দিনে দেবী দুর্গার চণ্ডিকা রূপে পূজা করে মানুষ মনে করে জীবনের সকল অশুভ শক্তি দূর হয়ে যাবে এবং ন্যায় ও শান্তির প্রতিষ্ঠা হবে।
নবমী পূজা কেবল ধর্মীয় আচার নয়, বরং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনের এক বিশাল উৎসব। তাই নবমীর তাৎপর্য বহুমাত্রিক—আধ্যাত্মিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক দিক থেকে এটি বাঙালি জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।
দেবী দুর্গার শক্তির পূর্ণ প্রকাশ নবমীতে ঘটে।ভক্তদের মনে সাহস, ভক্তি ও আত্মবিশ্বাস জন্মায়। অশুভ শক্তির বিনাশের মাধ্যমে ন্যায় প্রতিষ্ঠার বার্তা দেয়। নবমী হলো সম্প্রীতির উৎসব। সমাজের সব স্তরের মানুষ একত্রে পূজা উদযাপন করে।
বর্তমান যুগে নবমী কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং এক প্রকার সামাজিক উৎসব। পুজো প্যান্ডেল, শিল্পকলা, আলোসজ্জা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নবমীর আনন্দ বাড়িয়ে তোলে। নবমী পূজায় বিশেষভাবে দেবী দুর্গাকে চামুণ্ডা রূপে পূজা করা হয়।
দেবীকে আসনে প্রতিষ্ঠা করে পূজা শুরু হয়।নবমীর দিনে দেবীকে শ্বেতবর্ণ বা মহাশক্তির প্রতীকী রূপে ভাবা হয়। নবমী হোম: নবমীর অন্যতম প্রধান আচার হলো হোম বা যজ্ঞ। অগ্নিতে আহুতি প্রদান করা হয়, যা অশুভ শক্তি বিনাশের প্রতীক। পুষ্পাঞ্জলি: ভক্তরা দেবীর চরণে ফুল অর্পণ করেন। বিশেষ মন্ত্রোচ্চারণসহ এই অঞ্জলি প্রদান করা হয়।
বহু স্থানে নবমীতে প্রতীকী বালিদান প্রথা আছে। এখন মূলত লাউ, কুমড়া, কলা ইত্যাদি ফল দিয়ে বালির আচার সম্পন্ন হয়।অষ্টমীর মতো নবমীতেও কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হয়।কন্যাশিশুকে দেবীর প্রতীক হিসেবে পূজা করা হয়।
সুমন চক্রবর্তী
গণমাধ্যমকর্মী ও মুক্তলেখক