ঢাকা ১১:২২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৭ দিন ধরে মর্গে বাছুল মাঝির মরদেহ, আটকে আছে আরেক বন্দির লাশ

সাজা শেষ, তবু দেশে ফেরা হয়নি ৪৫ ভারতীয় বন্দির

শফিকুল ইসলাম, যশোর
  • আপডেট সময় : ১০:১৯:৪৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
  • / ১৫ বার পঠিত

সাজা শেষ, তবু মুক্তি নেই। জীবিত অবস্থায় স্বদেশে ফিরতে না পারা ভারতীয় নাগরিক বাছুল মাঝির মরদেহ ১৭ দিন ধরে পড়ে আছে যশোর জেনারেল হাসপাতালের মর্গে। একই মর্গে রয়েছে আরেক ভারতীয় বন্দি গাজী মন্ডলের মরদেহ। দুই দেশের প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক জটিলতায় তাঁদের শেষ ঠিকানা এখনো অনিশ্চিত।

শুধু মরদেহ নয়, যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে সাজা শেষ হওয়ার পরও দেশে ফিরতে পারছেন না ৪৫ জন ভারতীয় বন্দি। তাঁদের কারও অপেক্ষা কয়েক বছর, কারও এক দশকেরও বেশি। দীর্ঘ বন্দিজীবনে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, কারও মানসিক অবস্থার অবনতি হয়েছে।

ভারতের উত্তরপ্রদেশের বাসিন্দা বাছুল মাঝি ২০১৩ সালে অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে আটক হন। ছয় মাসের সাজা শেষে ২০১৮ সালে তাঁকে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। বন্দি অবস্থায় সিজোফ্রেনিয়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হন তিনি। গত ৯ অক্টোবর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

অন্যদিকে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার বাসিন্দা গাজী মন্ডল অস্ত্র মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ছিলেন। গত ১৯ অক্টোবর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে নেওয়ার পর তাঁর মৃত্যু হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসায় মরদেহ দুটি মর্গে রাখা হয়েছে।

যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়াত জানান, মর্গের চারটি চেম্বারের একটি দীর্ঘদিন নষ্ট। বাকি তিনটির মধ্যে দুটি ভারতীয় বন্দির মরদেহ দখল করে আছে। এতে অন্য মরদেহ সংরক্ষণে সমস্যা হচ্ছে। এ বিষয়ে কারা কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

কারা সূত্র জানায়, যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে ৫২ জন ভারতীয় বন্দি রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৪৫ জনের সাজা শেষ হয়েছে। কারও ১৫ দিন থেকে দুই বছরের সাজা থাকলেও প্রত্যাবাসন জটিলতায় আট থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত কারাগারে থাকতে হচ্ছে। অধিকাংশই বয়স্ক; ২৪ জনের বয়স ৫০ বছরের বেশি।

যশোরের সিনিয়র আইনজীবী আমিনুর রহমান হিরু বলেন, সাজা শেষ হওয়ার পরও বছরের পর বছর বন্দি থাকা দুঃখজনক। দুই দেশের সরকারকে দ্রুত তাঁদের স্বজনদের কাছে ফেরানোর উদ্যোগ নিতে হবে।

রাইটস যশোরের নির্বাহী পরিচালক বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক বলেন, প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক জটিলতা থাকলেও মানবিক বিবেচনায় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার দ্রুত নিষ্পত্তি জরুরি। মৃত্যুর পর মরদেহের মর্যাদাপূর্ণ শেষকৃত্য নিশ্চিত করাও মানবাধিকারের অংশ।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান জানান, অধিকাংশ বন্দির প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন রয়েছে। তবে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদন না মেলায় তাঁদের ফেরত পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। ভারতীয় হাইকমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। প্রয়োজনে আদালতের মাধ্যমে ফেরত পাঠানোর বিকল্পও ভাবা হচ্ছে।

সাজা শেষ, তবু বন্দিত্ব; মৃত্যুর পরও মরদেহের অপেক্ষা—কূটনৈতিক জটিলতায় আটকে ৪৫ ভারতীয় বন্দির স্বদেশে ফেরার আকুতি।

ট্যাগস :

১৭ দিন ধরে মর্গে বাছুল মাঝির মরদেহ, আটকে আছে আরেক বন্দির লাশ

সাজা শেষ, তবু দেশে ফেরা হয়নি ৪৫ ভারতীয় বন্দির

আপডেট সময় : ১০:১৯:৪৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

সাজা শেষ, তবু মুক্তি নেই। জীবিত অবস্থায় স্বদেশে ফিরতে না পারা ভারতীয় নাগরিক বাছুল মাঝির মরদেহ ১৭ দিন ধরে পড়ে আছে যশোর জেনারেল হাসপাতালের মর্গে। একই মর্গে রয়েছে আরেক ভারতীয় বন্দি গাজী মন্ডলের মরদেহ। দুই দেশের প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক জটিলতায় তাঁদের শেষ ঠিকানা এখনো অনিশ্চিত।

শুধু মরদেহ নয়, যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে সাজা শেষ হওয়ার পরও দেশে ফিরতে পারছেন না ৪৫ জন ভারতীয় বন্দি। তাঁদের কারও অপেক্ষা কয়েক বছর, কারও এক দশকেরও বেশি। দীর্ঘ বন্দিজীবনে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, কারও মানসিক অবস্থার অবনতি হয়েছে।

ভারতের উত্তরপ্রদেশের বাসিন্দা বাছুল মাঝি ২০১৩ সালে অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে আটক হন। ছয় মাসের সাজা শেষে ২০১৮ সালে তাঁকে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। বন্দি অবস্থায় সিজোফ্রেনিয়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হন তিনি। গত ৯ অক্টোবর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

অন্যদিকে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার বাসিন্দা গাজী মন্ডল অস্ত্র মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ছিলেন। গত ১৯ অক্টোবর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে নেওয়ার পর তাঁর মৃত্যু হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসায় মরদেহ দুটি মর্গে রাখা হয়েছে।

যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়াত জানান, মর্গের চারটি চেম্বারের একটি দীর্ঘদিন নষ্ট। বাকি তিনটির মধ্যে দুটি ভারতীয় বন্দির মরদেহ দখল করে আছে। এতে অন্য মরদেহ সংরক্ষণে সমস্যা হচ্ছে। এ বিষয়ে কারা কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

কারা সূত্র জানায়, যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে ৫২ জন ভারতীয় বন্দি রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৪৫ জনের সাজা শেষ হয়েছে। কারও ১৫ দিন থেকে দুই বছরের সাজা থাকলেও প্রত্যাবাসন জটিলতায় আট থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত কারাগারে থাকতে হচ্ছে। অধিকাংশই বয়স্ক; ২৪ জনের বয়স ৫০ বছরের বেশি।

যশোরের সিনিয়র আইনজীবী আমিনুর রহমান হিরু বলেন, সাজা শেষ হওয়ার পরও বছরের পর বছর বন্দি থাকা দুঃখজনক। দুই দেশের সরকারকে দ্রুত তাঁদের স্বজনদের কাছে ফেরানোর উদ্যোগ নিতে হবে।

রাইটস যশোরের নির্বাহী পরিচালক বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক বলেন, প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক জটিলতা থাকলেও মানবিক বিবেচনায় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার দ্রুত নিষ্পত্তি জরুরি। মৃত্যুর পর মরদেহের মর্যাদাপূর্ণ শেষকৃত্য নিশ্চিত করাও মানবাধিকারের অংশ।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান জানান, অধিকাংশ বন্দির প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন রয়েছে। তবে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদন না মেলায় তাঁদের ফেরত পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। ভারতীয় হাইকমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। প্রয়োজনে আদালতের মাধ্যমে ফেরত পাঠানোর বিকল্পও ভাবা হচ্ছে।

সাজা শেষ, তবু বন্দিত্ব; মৃত্যুর পরও মরদেহের অপেক্ষা—কূটনৈতিক জটিলতায় আটকে ৪৫ ভারতীয় বন্দির স্বদেশে ফেরার আকুতি।