ঢাকা ০৩:১০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাঘারপাড়ায় আখের বাম্পার ফলন

বাঘারপাড়া (যশোর) প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় : ০২:১৯:৩৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
  • / ১৭ বার পঠিত

যশোরের বাঘারপাড়ায় এবার আখের বাম্পার ফলন হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া, রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ কম থাকায় আখের উৎপাদন ভালো হয়েছে। ধান চাষের তুলনায় আখ চাষে লাভের সম্ভাবনা বেশি হওয়ায় দিন দিন এ ফসলের দিকে ঝুঁকছেন কৃষকেরা।

শুধু স্থানীয় বাজার নয়, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, খুলনা ও সাতক্ষীরা থেকে ব্যবসায়ীরা সরাসরি আখের ক্ষেতে এসে আখ কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। এতে কৃষকেরা যেমন বিক্রির সুযোগ পাচ্ছেন, তেমনি আখকে ঘিরে জমে উঠেছে স্থানীয় কৃষি অর্থনীতি।

তবে আখের উৎপাদন ভালো হলেও চাষের পদ্ধতি নিয়ে কৃষকদের সতর্ক করেছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইয়েদা নাসরিন জাহান। তাঁর পরামর্শ, একই জমিতে প্রতিবছর আখ চাষ না করে এক বছর বিরতি দিয়ে আখ চাষ করা উচিত। কারণ, বারবার একই জমিতে আখ চাষ করলে মাটির উর্বরতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত বছর বাঘারপাড়ায় ৮০ হেক্টর জমিতে আখের চাষ হয়েছিল। চলতি মৌসুমেও প্রায় একই পরিমাণ জমিতে আখের আবাদ হয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গেন্ডারি জাতের আখের চাষ বেশি হয়েছে।

কৃষি কর্মকর্তারা জানান সাইয়েদা নাসরিন জাহান, এবার আখ চাষের জন্য আবহাওয়া অনুকূলে ছিল। রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ তুলনামূলক কম থাকায় ফলন ভালো হয়েছে। পাশাপাশি উন্নত জাত নির্বাচন ও ভালো মানের বীজ ব্যবহারের বিষয়ে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। এসব কারণে আখের উৎপাদনে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

উপজেলার দোহাকুলা ইউনিয়নের শুকদেবনগর, ছাইবাড়িয়া, নয়াপাড়া, খলিশী, বহরামপুর ও ইন্দ্র গ্রামে আখের আবাদ বেশি হয়েছে। এ ছাড়া জামদিয়া ইউনিয়নের দাঁতপুর ও করিমপুর, দরাজহাট ইউনিয়নের দরাজহাট, হাবুল্যা, মহিরন ও লক্ষ্মীপুরসহ নারিকেলবাড়িয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় আখ চাষ করেছেন কৃষকেরা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, আখের ক্ষেত থেকে ফসল কাটা, পরিষ্কার করা ও বিক্রির প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষিরা। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ব্যবসায়ীরা সরাসরি ক্ষেত থেকে আখ কিনে নিচ্ছেন। এতে পরিবহন ও বাজারজাতকরণের কিছু ঝামেলা কমছে কৃষকদের।

কৃষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি পিস আখ পাইকারি ২৫ থেকে ৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে খুচরা বাজারে একটি আখ ৮০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। পাইকারি ও খুচরা দামের এই ব্যবধান নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।

দোহাকুলা ইউনিয়নের শুকদেবনগর গ্রামের আখচাষি সাইদুর রহমান এবার ৬২ শতক জমিতে আখ চাষ করেছেন। ভালো ফলন হলেও উৎপাদন খরচের তুলনায় প্রত্যাশিত লাভ পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন তিনি।

সাইদুর রহমান বলেন, আখের চারা কেনা থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ক্ষেত থেকে আখ কেটে বিক্রি শুরু করেছি। আশা করছি, এবার প্রায় ৪ লাখ টাকার আখ বিক্রি করতে পারব। তবে আখের ভালো দাম না পেলে লাভ কমে যাবে।

অন্যদিকে, দোহাকুলা গ্রামের কৃষক অলিদ হোসেন এবার প্রথমবারের মতো ২৯ শতক জমিতে আখ চাষ করেছেন। তাঁর দাবি, প্রায় ১ লাখ টাকা খরচ করে তিনি ইতোমধ্যে ব্যবসায়ীদের কাছে ২ লাখ ৮৫ হাজার টাকার আখ বিক্রি করেছেন। তাঁর হিসাবে, এতে প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার টাকা লাভ হয়েছে।

কৃষকদের এমন সাফল্য দেখে অন্য কৃষকেরাও আখ চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। তবে লাভের হিসাব নির্ভর করছে উৎপাদন খরচ, বিক্রির পরিমাণ, বাজারদর ও অন্যান্য ব্যয়ের ওপর।

বাঘারপাড়ার আখের বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতার আনাগোনার পাশাপাশি আখের খুচরা দাম নিয়েও আলোচনা রয়েছে। এক ব্যবসায়ী আক্ষেপ করে বলেন, আখ এখন আর গরিবের খাবার নেই। একটি আখ কিনতেই ৮০ থেকে ১০০ টাকা লাগছে।

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, উৎপাদন খরচ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের ব্যয় খুচরা দামের ওপর প্রভাব ফেলছে। তবে পাইকারি পর্যায়ে কৃষকের কাছ থেকে যে দামে আখ কেনা হচ্ছে, খুচরা বাজারে তার চেয়ে অনেক বেশি দামে বিক্রি হওয়ায় মধ্যস্বত্বভোগী ও বিপণনব্যবস্থার ভূমিকা নিয়েও আলোচনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইয়েদা নাসরিন জাহান বলেন, অনুকূল আবহাওয়া এবং রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ কম থাকায় এবার আখের ফলন ভালো হয়েছে। কৃষকদের উন্নত জাত নির্বাচন ও আধুনিক পদ্ধতিতে আখ চাষের বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আখ চাষে সারের প্রয়োজন হয়। একই জমিতে প্রতিবছর আখ চাষ করলে মাটির উর্বরতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে এক বছর বিরতি দিয়ে আখ চাষের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, যাতে জমির উর্বরতা রক্ষা ও দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন বজায় রাখা যায়।

কৃষকদের প্রত্যাশা, বাঘারপাড়ার আখ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আরও বেশি বাজার পেলে চাষিরা ন্যায্যমূল্য পাবেন। পাশাপাশি মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করে পরিকল্পিতভাবে আখ চাষ করা গেলে এ ফসল ভবিষ্যতে কৃষকদের আয়ের অন্যতম উৎস হয়ে উঠতে পারে।

ট্যাগস :

বাঘারপাড়ায় আখের বাম্পার ফলন

আপডেট সময় : ০২:১৯:৩৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

যশোরের বাঘারপাড়ায় এবার আখের বাম্পার ফলন হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া, রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ কম থাকায় আখের উৎপাদন ভালো হয়েছে। ধান চাষের তুলনায় আখ চাষে লাভের সম্ভাবনা বেশি হওয়ায় দিন দিন এ ফসলের দিকে ঝুঁকছেন কৃষকেরা।

শুধু স্থানীয় বাজার নয়, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, খুলনা ও সাতক্ষীরা থেকে ব্যবসায়ীরা সরাসরি আখের ক্ষেতে এসে আখ কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। এতে কৃষকেরা যেমন বিক্রির সুযোগ পাচ্ছেন, তেমনি আখকে ঘিরে জমে উঠেছে স্থানীয় কৃষি অর্থনীতি।

তবে আখের উৎপাদন ভালো হলেও চাষের পদ্ধতি নিয়ে কৃষকদের সতর্ক করেছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইয়েদা নাসরিন জাহান। তাঁর পরামর্শ, একই জমিতে প্রতিবছর আখ চাষ না করে এক বছর বিরতি দিয়ে আখ চাষ করা উচিত। কারণ, বারবার একই জমিতে আখ চাষ করলে মাটির উর্বরতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত বছর বাঘারপাড়ায় ৮০ হেক্টর জমিতে আখের চাষ হয়েছিল। চলতি মৌসুমেও প্রায় একই পরিমাণ জমিতে আখের আবাদ হয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গেন্ডারি জাতের আখের চাষ বেশি হয়েছে।

কৃষি কর্মকর্তারা জানান সাইয়েদা নাসরিন জাহান, এবার আখ চাষের জন্য আবহাওয়া অনুকূলে ছিল। রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ তুলনামূলক কম থাকায় ফলন ভালো হয়েছে। পাশাপাশি উন্নত জাত নির্বাচন ও ভালো মানের বীজ ব্যবহারের বিষয়ে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। এসব কারণে আখের উৎপাদনে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

উপজেলার দোহাকুলা ইউনিয়নের শুকদেবনগর, ছাইবাড়িয়া, নয়াপাড়া, খলিশী, বহরামপুর ও ইন্দ্র গ্রামে আখের আবাদ বেশি হয়েছে। এ ছাড়া জামদিয়া ইউনিয়নের দাঁতপুর ও করিমপুর, দরাজহাট ইউনিয়নের দরাজহাট, হাবুল্যা, মহিরন ও লক্ষ্মীপুরসহ নারিকেলবাড়িয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় আখ চাষ করেছেন কৃষকেরা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, আখের ক্ষেত থেকে ফসল কাটা, পরিষ্কার করা ও বিক্রির প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষিরা। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ব্যবসায়ীরা সরাসরি ক্ষেত থেকে আখ কিনে নিচ্ছেন। এতে পরিবহন ও বাজারজাতকরণের কিছু ঝামেলা কমছে কৃষকদের।

কৃষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি পিস আখ পাইকারি ২৫ থেকে ৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে খুচরা বাজারে একটি আখ ৮০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। পাইকারি ও খুচরা দামের এই ব্যবধান নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।

দোহাকুলা ইউনিয়নের শুকদেবনগর গ্রামের আখচাষি সাইদুর রহমান এবার ৬২ শতক জমিতে আখ চাষ করেছেন। ভালো ফলন হলেও উৎপাদন খরচের তুলনায় প্রত্যাশিত লাভ পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন তিনি।

সাইদুর রহমান বলেন, আখের চারা কেনা থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ক্ষেত থেকে আখ কেটে বিক্রি শুরু করেছি। আশা করছি, এবার প্রায় ৪ লাখ টাকার আখ বিক্রি করতে পারব। তবে আখের ভালো দাম না পেলে লাভ কমে যাবে।

অন্যদিকে, দোহাকুলা গ্রামের কৃষক অলিদ হোসেন এবার প্রথমবারের মতো ২৯ শতক জমিতে আখ চাষ করেছেন। তাঁর দাবি, প্রায় ১ লাখ টাকা খরচ করে তিনি ইতোমধ্যে ব্যবসায়ীদের কাছে ২ লাখ ৮৫ হাজার টাকার আখ বিক্রি করেছেন। তাঁর হিসাবে, এতে প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার টাকা লাভ হয়েছে।

কৃষকদের এমন সাফল্য দেখে অন্য কৃষকেরাও আখ চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। তবে লাভের হিসাব নির্ভর করছে উৎপাদন খরচ, বিক্রির পরিমাণ, বাজারদর ও অন্যান্য ব্যয়ের ওপর।

বাঘারপাড়ার আখের বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতার আনাগোনার পাশাপাশি আখের খুচরা দাম নিয়েও আলোচনা রয়েছে। এক ব্যবসায়ী আক্ষেপ করে বলেন, আখ এখন আর গরিবের খাবার নেই। একটি আখ কিনতেই ৮০ থেকে ১০০ টাকা লাগছে।

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, উৎপাদন খরচ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের ব্যয় খুচরা দামের ওপর প্রভাব ফেলছে। তবে পাইকারি পর্যায়ে কৃষকের কাছ থেকে যে দামে আখ কেনা হচ্ছে, খুচরা বাজারে তার চেয়ে অনেক বেশি দামে বিক্রি হওয়ায় মধ্যস্বত্বভোগী ও বিপণনব্যবস্থার ভূমিকা নিয়েও আলোচনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইয়েদা নাসরিন জাহান বলেন, অনুকূল আবহাওয়া এবং রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ কম থাকায় এবার আখের ফলন ভালো হয়েছে। কৃষকদের উন্নত জাত নির্বাচন ও আধুনিক পদ্ধতিতে আখ চাষের বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আখ চাষে সারের প্রয়োজন হয়। একই জমিতে প্রতিবছর আখ চাষ করলে মাটির উর্বরতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে এক বছর বিরতি দিয়ে আখ চাষের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, যাতে জমির উর্বরতা রক্ষা ও দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন বজায় রাখা যায়।

কৃষকদের প্রত্যাশা, বাঘারপাড়ার আখ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আরও বেশি বাজার পেলে চাষিরা ন্যায্যমূল্য পাবেন। পাশাপাশি মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করে পরিকল্পিতভাবে আখ চাষ করা গেলে এ ফসল ভবিষ্যতে কৃষকদের আয়ের অন্যতম উৎস হয়ে উঠতে পারে।