গাজীপুরে শ্রমিক আন্দোলনে দিনভর উত্তেজনা, বিজিবি মোতায়েন
- আপডেট সময় : ০৫:০৫:২৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
- / ৪৩ বার পঠিত

ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা মাসিক বেতনের দাবিতে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো আন্দোলন করেছেন পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা। রোববার (১ নভেম্বর) সকাল থেকে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে অবরোধ ও বিক্ষোভ করেন তাঁরা।
দিনভর উত্তেজনা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষে শ্রমিক, পুলিশ ও সাংবাদিকসহ অন্তত ৩২ জন আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পাঁচ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। শ্রমিক অসন্তোষের কারণে আশপাশের অন্তত ১০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা পর মহাসড়কে যান চলাচল শুরু হলেও শিল্পাঞ্চলে পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থা ফেরেনি।
রোববার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে কালিয়াকৈর উপজেলার সফিপুর এলাকায় শ্রমিকেরা কারখানায় কাজে যোগ দেওয়ার পর বেরিয়ে এসে মহাসড়কে অবস্থান নেন। পরে আশপাশের বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকেরাও তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন। একপর্যায়ে হাজারো শ্রমিকের অবরোধে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে কয়েক কিলোমিটারজুড়ে যানজটের সৃষ্টি হয়। চরম ভোগান্তিতে পড়েন দূরপাল্লার যাত্রী ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
দিনভর আন্দোলন চলাকালে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এ সময় বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় যমুনা ব্যাংকসহ বিভিন্ন স্থাপনায় ভাঙচুর করা হয়। মৌচাক এলাকার পুলিশ বক্স ভাঙচুর এবং কোনাবাড়ী পুলিশ বক্সে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া আনসার একাডেমির সামনে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। বিভিন্ন কারখানার ফটকেও ভাঙচুর চালানো হয়।
এদিকে চন্দ্রা-পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে দীপ্ত টেলিভিশনের গাজীপুর প্রতিনিধি জাহাঙ্গীর আলম ও দৈনিক কালের কণ্ঠের কালিয়াকৈর প্রতিনিধি মাহবুব হাসান মেহেদীর ওপর হামলা ও মারধরের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় তাঁদের ক্যামেরা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
পরিস্থিতি বিবেচনায় সফিপুর, মৌচাক ও আশপাশের এলাকার অন্তত ৮ থেকে ১০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। শ্রমিকদের আন্দোলন ও অবরোধের কারণে শিল্পাঞ্চলের স্বাভাবিক উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
শ্রমিক অসন্তোষ ও সংঘর্ষের পর নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের গাজীপুর অংশে পাঁচ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। আগামী ৭ নভেম্বর পর্যন্ত তাঁদের দায়িত্ব পালনের কথা জানিয়েছে শিল্প পুলিশ।
গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন জানান, কোনাবাড়ী, সফিপুর ও কালিয়াকৈরসহ আশপাশের এলাকায় শিল্প পুলিশের সঙ্গে বিজিবি সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিজিবি সদস্য মোতায়েন রাখা হবে।
কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম (পিপিএম) জানান, শ্রমিকদের আন্দোলনে অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। রোববার সকাল সাড়ে ৮টা থেকেই শ্রমিকদের বিক্ষোভ অব্যাহত ছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এর আগে শনিবার (৩১ অক্টোবর) একই দাবিতে চন্দ্রার পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় শ্রমিকেরা মহাসড়ক অবরোধ করেন। দুপুর থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন চন্দ্রা, পল্লী বিদ্যুৎ, সফিপুর, মৌচাক ও কোনাবাড়ী এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। সংঘর্ষে শ্রমিক ও পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ৩২ জন আহত হন। আহত শ্রমিকদের স্থানীয় বিভিন্ন ক্লিনিকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। শনিবার রাত সাড়ে ৭টার দিকে শ্রমিকেরা মহাসড়ক থেকে সরে গেলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। তবে রোববার সকালে আবারও অবরোধ শুরু হওয়ায় নতুন করে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়।
শ্রমিকদের দাবি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাঁদের ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে হবে। বর্তমান বেতনে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ায় তাঁরা এ দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন।
এদিকে শ্রমিকদের দাবি বিবেচনায় সরকার মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। এ ঘোষণার পর আন্দোলন থেকে সরে এসে শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন শ্রমিক নেতারা।
শ্রমিক নেতা শাকিল জানান, তাঁদের আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল শ্রমিকদের জন্য নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করা। সরকার ইতোমধ্যে মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেওয়ায় আপাতত তাঁদের আর আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা নেই বলে মনে করছেন। সোমবার সকাল থেকেই শ্রমিকেরা নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরে কাজে যোগ দেবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
শ্রমিক নেত্রী স্মৃতি জানান, সরকার মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেওয়ায় শ্রমিকদের ঘরে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। তাঁদের মূল দাবি ছিল ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা বেতন নির্ধারণের জন্য মজুরি বোর্ড গঠন করা। সেই ঘোষণা আসায় আপাতত তাঁদের আর কিছু বলার নেই।
তিনি বলেন, শ্রমিকদের আগামীকাল সকাল থেকে নিজ নিজ কর্মস্থলে কাজে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছি। এখন কারা বা কোন পক্ষ আন্দোলন করছে, তা আমাদের জানা নেই। প্রশাসনের কাছে দাবি, যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে, তাদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক।
প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা অবরোধের পর ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচল শুরু হলেও শিল্পাঞ্চলে পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থা ফেরেনি। শ্রমিক নেতাদের কাজে ফেরার আহ্বানের পর সোমবার কারখানাগুলোতে শ্রমিকদের উপস্থিতি ও উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক হয় কি-না, এখন সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্টদের।




















