ঢাকা ০৬:৩০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
ইউএনও-কৃষি কর্মকর্তার দিকে অভিযোগের তীর

চৌগাছায় নীতিমালার তোয়াক্কা না করে সার ডিলার নিয়োগ

হাফিজুর রহমান, চৌগাছা (যশোর )
  • আপডেট সময় : ০৪:১৪:৩৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬
  • / ১০২ বার পঠিত

যশোরের চৌগাছা উপজেলার স্বরূপদাহ ইউনিয়নে সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম, নীতিমালা লঙ্ঘন ও অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারাজানা খাতুন এবং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুশাব্বির হোসাইনের বিরুদ্ধে। প্রয়োজনীয় ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা, নিজস্ব বা বৈধভাবে ভাড়া নেওয়া গুদাম এবং দৃশ্যমান ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান না থাকা সত্ত্বেও মেসার্স মাহিম ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী জাহাঙ্গীর আলমকে ডিলার হিসেবে চূড়ান্ত করার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।

এ ঘটনায় দীর্ঘদিন ধরে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত একাধিক আবেদনকারীকে বাদ দেওয়ায় ক্ষোভ ছড়িয়েছে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সচেতন মহলে। অভিযোগ উঠেছে, গুদাম যাচাই, আবেদনকারীদের অভিজ্ঞতা মূল্যায়ন এবং মনিটরিং কমিটির তদন্তেও যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি।

স্থানীয় সূত্র ও অভিযোগকারীদের তথ্য অনুযায়ী, স্বরূপদাহ ইউনিয়নে সার ডিলারশিপের জন্য একাধিক ব্যক্তি আবেদন করেন। তাঁদের মধ্যে মেসার্স ফয়সাল ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী হাবিবুর রহমান হবি, আব্দুর সাত্তার এবং মেসার্স মাহিম ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী জাহাঙ্গীর আলম ছিলেন।

অভিযোগকারী হাবিবুর রহমান হবি দীর্ঘ ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে সার, বীজ ও কীটনাশকের ব্যবসা করছেন। তাঁর নিজস্ব গুদাম ও ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। অন্যদিকে আব্দুর সাত্তারের কোনো গুদাম ও সার বিক্রির অভিজ্ঞতা নেই বলে অভিযোগ উঠেছে। এ অবস্থায় অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমানকে বাদ দিয়ে মাহিম ট্রেডার্সকে চূড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

সবচেয়ে গুরুতর বিতর্ক তৈরি হয়েছে মাহিম ট্রেডার্সের গুদাম নিয়ে। অভিযোগ অনুযায়ী, জাহাঙ্গীর আলমের নিজস্ব কোনো গুদাম নেই। তিনি স্থানীয় একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একটি কক্ষকে গুদাম হিসেবে দেখিয়েছেন। একই কক্ষ উপজেলা বিএনপির মহিলা নেত্রী আলেয়া বেগমও গুদাম হিসেবে দেখিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

গুদামের মালিকানা নিয়ে জাহাঙ্গীর আলম ও আলেয়া বেগমের স্বামী লোটনের মধ্যে কৃষি কর্মকর্তার উপস্থিতিতে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।

স্বরূপদাহ ইউনিয়নের সংশ্লিষ্ট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহিনুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বিদ্যালয়ের কোনো ঘর জাহাঙ্গীর আলম বা আলেয়া বেগমের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়নি।

প্রধান শিক্ষক বলেন, বিদ্যালয়ের একটি ঘর বজলুর রহমান টায়ারের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। ওই ঘরে এখনো তাঁর পাট ও ধান মজুদ রয়েছে। জাহাঙ্গীর আলম বা আলেয়া বেগম বিদ্যালয়ের ঘর ভাড়া নেওয়ার কোনো কাগজ দেখালে তা যাচাই করা হবে। তবে বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তাঁদের কাউকে ঘর ভাড়া দেওয়া হয়নি।

প্রধান শিক্ষক আরও জানান, ভাড়া নেওয়া ঘরটি ভেঙে ফেলার জন্য বজলুর রহমানকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের এই বক্তব্যের পর সার ডিলার নিয়োগে দেখানো গুদামের বৈধতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, সার ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত ধারণক্ষমতার গুদাম, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো যাচাই করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু মাহিম ট্রেডার্সের ক্ষেত্রে এসব শর্ত যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুসাব্বির হুসাইন এবং ইউএনও ফারাজানা বেগমের সমন্বয়ে মাহিম ট্রেডার্সকে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। মনিটরিং কমিটির সরেজমিন তদন্ত ও প্রতিবেদন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।

অভিযোগ রয়েছে, গুদাম না থাকা সত্ত্বেও কাগজপত্রে গুদাম দেখিয়ে আবেদন করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সহায়তায় সেই আবেদন গ্রহণ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত ও নথিপত্র যাচাই ছাড়া অনিয়মের বিষয়টি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, মাহিম ট্রেডার্সের মালিক জাহাঙ্গীর আলমের ভাই সাহাঙ্গীরের তদবিরের মাধ্যমে ডিলারশিপ পাওয়া গেছে। তাঁদের অভিযোগ, সাহাঙ্গীরের সঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ব্যক্তিগত পরিচয় রয়েছে।

এ ছাড়া সাহাঙ্গীরের রাজনৈতিক অতীত নিয়েও অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। তাঁদের দাবি, তিনি অতীতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করেছেন এবং মাশিলা এলাকায় বিএনপির নেতাকর্মীদের নির্যাতনের ঘটনায় তাঁর ভূমিকা ছিল।

এছাড়াও, চৌগাছা উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে সার ডিলার নিয়োগ নিয়েও অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা।

তাঁদের অভিযোগ, সুখপুকুরিয়া ইউনিয়নে বিশ্বাস এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী শ্যামল বিশ্বাসের বাবা মাদক মামলায় কারাবাস করেছেন। ধূলিয়ানী ইউনিয়নে লিমন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী রনজু বেগমের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার মামলা চলমান রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

নারায়ণপুর ইউনিয়নে আমেন ট্রেডার্সের পর্যাপ্ত গুদাম ও গুদাম ভাড়ার চুক্তি নেই বলে অভিযোগ উঠেছে। পাশাপোল ইউনিয়নে রিমন ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী ইমদাদুল হককে নিয়েও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

অভিযোগকারীদের দাবি, এসব আবেদনকারীর মধ্যে কেউ কেউ আগে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তাঁদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের ভিত্তিতে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট আবেদনপত্র, গুদামের দলিল, ভাড়ার চুক্তি, মনিটরিং কমিটির প্রতিবেদন এবং নিয়োগের চূড়ান্ত তালিকা যাচাই করা প্রয়োজন।

ডিলার নিয়োগে বাদ পড়া হাবিবুর রহমান হবি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমি ১০ থেকে ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে সব নিয়মনীতি মেনে সার, বীজ ও কীটনাশকের ব্যবসা করে আসছি। নীতিমালার সব শর্ত পূরণ করে আবেদন করার পরও আমাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। অথচ জাহাঙ্গীরের এখানে কোনো গুদাম নেই। তাঁকে রাতারাতি ডিলার বানিয়ে দেওয়া হলো! মনিটরিং কমিটি কী যাচাই করে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা বোধগম্য নয়।

তিনি বিতর্কিত নিয়োগ বাতিল করে সব আবেদনকারীর যোগ্যতা, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পুনরায় যাচাইয়ের দাবি জানান।

অভিযোগের বিষয়ে মেসার্স মাহিম ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমার ক্ষমতা আছে, আমি ডিলার নিয়োগ পেয়েছি। কার কী করার আছে, করুক।

তাঁর বক্তব্যে নিয়োগ প্রক্রিয়া ও গুদামসংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারাজানা খাতুনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার তাঁর কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। নিয়োগের চূড়ান্ত প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট নথির বিষয়ে জানতে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুশাব্বির হোসাইনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি কিছু জানি না। সবকিছু ইউএনও মহোদয় করেছেন, রিপোর্ট দিয়েছেন। গুদাম না থাকার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।

এ বিষয়ে যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন, প্রত্যেক উপজেলা থেকে যাচাই-বাছাই করে আমার কাছে পাঠানো হয়েছে। আমরা ঢাকায় পাঠিয়েছি, ঢাকা থেকে নিয়োগ করা হয়েছে। এর পরেও কোনো তথ্য গোপন করে নিয়মবহির্ভূতভাবে সার ডিলার নিয়োগ হলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও জানান, ছয়টি জেলার সার ডিলার নিয়োগ স্থগিত করা হয়েছে, যার মধ্যে যশোরও রয়েছে। তদন্ত কমিটি আসবে এবং তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সার ডিলার নিয়োগে ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা, গুদামের বৈধতা, আবেদনকারীর যোগ্যতা এবং মনিটরিং কমিটির যাচাই-বাছাই কতটা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে, তা নিয়ে চৌগাছায় প্রশ্ন উঠেছে।

বিশেষ করে বিদ্যালয়ের ঘরকে গুদাম হিসেবে দেখানোর অভিযোগ এবং একই ঘর একাধিক আবেদনকারীর নামে দেখানোর বিষয়টি তদন্তের দাবি জোরালো করেছে।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, নিয়োগের চূড়ান্ত তালিকা কে তৈরি করেছেন, কোন মানদণ্ডে আবেদনকারীদের বাছাই করা হয়েছে এবং গুদাম যাচাইয়ের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা কী প্রতিবেদন দিয়েছেন?

অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম, তথ্য গোপন বা নীতিমালা লঙ্ঘন পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সচেতন নাগরিকরা।

ট্যাগস :

ইউএনও-কৃষি কর্মকর্তার দিকে অভিযোগের তীর

চৌগাছায় নীতিমালার তোয়াক্কা না করে সার ডিলার নিয়োগ

আপডেট সময় : ০৪:১৪:৩৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬

যশোরের চৌগাছা উপজেলার স্বরূপদাহ ইউনিয়নে সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম, নীতিমালা লঙ্ঘন ও অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারাজানা খাতুন এবং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুশাব্বির হোসাইনের বিরুদ্ধে। প্রয়োজনীয় ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা, নিজস্ব বা বৈধভাবে ভাড়া নেওয়া গুদাম এবং দৃশ্যমান ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান না থাকা সত্ত্বেও মেসার্স মাহিম ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী জাহাঙ্গীর আলমকে ডিলার হিসেবে চূড়ান্ত করার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।

এ ঘটনায় দীর্ঘদিন ধরে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত একাধিক আবেদনকারীকে বাদ দেওয়ায় ক্ষোভ ছড়িয়েছে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সচেতন মহলে। অভিযোগ উঠেছে, গুদাম যাচাই, আবেদনকারীদের অভিজ্ঞতা মূল্যায়ন এবং মনিটরিং কমিটির তদন্তেও যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি।

স্থানীয় সূত্র ও অভিযোগকারীদের তথ্য অনুযায়ী, স্বরূপদাহ ইউনিয়নে সার ডিলারশিপের জন্য একাধিক ব্যক্তি আবেদন করেন। তাঁদের মধ্যে মেসার্স ফয়সাল ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী হাবিবুর রহমান হবি, আব্দুর সাত্তার এবং মেসার্স মাহিম ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী জাহাঙ্গীর আলম ছিলেন।

অভিযোগকারী হাবিবুর রহমান হবি দীর্ঘ ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে সার, বীজ ও কীটনাশকের ব্যবসা করছেন। তাঁর নিজস্ব গুদাম ও ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। অন্যদিকে আব্দুর সাত্তারের কোনো গুদাম ও সার বিক্রির অভিজ্ঞতা নেই বলে অভিযোগ উঠেছে। এ অবস্থায় অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমানকে বাদ দিয়ে মাহিম ট্রেডার্সকে চূড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

সবচেয়ে গুরুতর বিতর্ক তৈরি হয়েছে মাহিম ট্রেডার্সের গুদাম নিয়ে। অভিযোগ অনুযায়ী, জাহাঙ্গীর আলমের নিজস্ব কোনো গুদাম নেই। তিনি স্থানীয় একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একটি কক্ষকে গুদাম হিসেবে দেখিয়েছেন। একই কক্ষ উপজেলা বিএনপির মহিলা নেত্রী আলেয়া বেগমও গুদাম হিসেবে দেখিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

গুদামের মালিকানা নিয়ে জাহাঙ্গীর আলম ও আলেয়া বেগমের স্বামী লোটনের মধ্যে কৃষি কর্মকর্তার উপস্থিতিতে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।

স্বরূপদাহ ইউনিয়নের সংশ্লিষ্ট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহিনুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বিদ্যালয়ের কোনো ঘর জাহাঙ্গীর আলম বা আলেয়া বেগমের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়নি।

প্রধান শিক্ষক বলেন, বিদ্যালয়ের একটি ঘর বজলুর রহমান টায়ারের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। ওই ঘরে এখনো তাঁর পাট ও ধান মজুদ রয়েছে। জাহাঙ্গীর আলম বা আলেয়া বেগম বিদ্যালয়ের ঘর ভাড়া নেওয়ার কোনো কাগজ দেখালে তা যাচাই করা হবে। তবে বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তাঁদের কাউকে ঘর ভাড়া দেওয়া হয়নি।

প্রধান শিক্ষক আরও জানান, ভাড়া নেওয়া ঘরটি ভেঙে ফেলার জন্য বজলুর রহমানকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের এই বক্তব্যের পর সার ডিলার নিয়োগে দেখানো গুদামের বৈধতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, সার ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত ধারণক্ষমতার গুদাম, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো যাচাই করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু মাহিম ট্রেডার্সের ক্ষেত্রে এসব শর্ত যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুসাব্বির হুসাইন এবং ইউএনও ফারাজানা বেগমের সমন্বয়ে মাহিম ট্রেডার্সকে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। মনিটরিং কমিটির সরেজমিন তদন্ত ও প্রতিবেদন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।

অভিযোগ রয়েছে, গুদাম না থাকা সত্ত্বেও কাগজপত্রে গুদাম দেখিয়ে আবেদন করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সহায়তায় সেই আবেদন গ্রহণ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত ও নথিপত্র যাচাই ছাড়া অনিয়মের বিষয়টি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, মাহিম ট্রেডার্সের মালিক জাহাঙ্গীর আলমের ভাই সাহাঙ্গীরের তদবিরের মাধ্যমে ডিলারশিপ পাওয়া গেছে। তাঁদের অভিযোগ, সাহাঙ্গীরের সঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ব্যক্তিগত পরিচয় রয়েছে।

এ ছাড়া সাহাঙ্গীরের রাজনৈতিক অতীত নিয়েও অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। তাঁদের দাবি, তিনি অতীতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করেছেন এবং মাশিলা এলাকায় বিএনপির নেতাকর্মীদের নির্যাতনের ঘটনায় তাঁর ভূমিকা ছিল।

এছাড়াও, চৌগাছা উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে সার ডিলার নিয়োগ নিয়েও অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা।

তাঁদের অভিযোগ, সুখপুকুরিয়া ইউনিয়নে বিশ্বাস এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী শ্যামল বিশ্বাসের বাবা মাদক মামলায় কারাবাস করেছেন। ধূলিয়ানী ইউনিয়নে লিমন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী রনজু বেগমের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার মামলা চলমান রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

নারায়ণপুর ইউনিয়নে আমেন ট্রেডার্সের পর্যাপ্ত গুদাম ও গুদাম ভাড়ার চুক্তি নেই বলে অভিযোগ উঠেছে। পাশাপোল ইউনিয়নে রিমন ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী ইমদাদুল হককে নিয়েও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

অভিযোগকারীদের দাবি, এসব আবেদনকারীর মধ্যে কেউ কেউ আগে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তাঁদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের ভিত্তিতে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট আবেদনপত্র, গুদামের দলিল, ভাড়ার চুক্তি, মনিটরিং কমিটির প্রতিবেদন এবং নিয়োগের চূড়ান্ত তালিকা যাচাই করা প্রয়োজন।

ডিলার নিয়োগে বাদ পড়া হাবিবুর রহমান হবি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমি ১০ থেকে ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে সব নিয়মনীতি মেনে সার, বীজ ও কীটনাশকের ব্যবসা করে আসছি। নীতিমালার সব শর্ত পূরণ করে আবেদন করার পরও আমাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। অথচ জাহাঙ্গীরের এখানে কোনো গুদাম নেই। তাঁকে রাতারাতি ডিলার বানিয়ে দেওয়া হলো! মনিটরিং কমিটি কী যাচাই করে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা বোধগম্য নয়।

তিনি বিতর্কিত নিয়োগ বাতিল করে সব আবেদনকারীর যোগ্যতা, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পুনরায় যাচাইয়ের দাবি জানান।

অভিযোগের বিষয়ে মেসার্স মাহিম ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমার ক্ষমতা আছে, আমি ডিলার নিয়োগ পেয়েছি। কার কী করার আছে, করুক।

তাঁর বক্তব্যে নিয়োগ প্রক্রিয়া ও গুদামসংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারাজানা খাতুনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার তাঁর কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। নিয়োগের চূড়ান্ত প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট নথির বিষয়ে জানতে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুশাব্বির হোসাইনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি কিছু জানি না। সবকিছু ইউএনও মহোদয় করেছেন, রিপোর্ট দিয়েছেন। গুদাম না থাকার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।

এ বিষয়ে যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন, প্রত্যেক উপজেলা থেকে যাচাই-বাছাই করে আমার কাছে পাঠানো হয়েছে। আমরা ঢাকায় পাঠিয়েছি, ঢাকা থেকে নিয়োগ করা হয়েছে। এর পরেও কোনো তথ্য গোপন করে নিয়মবহির্ভূতভাবে সার ডিলার নিয়োগ হলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও জানান, ছয়টি জেলার সার ডিলার নিয়োগ স্থগিত করা হয়েছে, যার মধ্যে যশোরও রয়েছে। তদন্ত কমিটি আসবে এবং তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সার ডিলার নিয়োগে ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা, গুদামের বৈধতা, আবেদনকারীর যোগ্যতা এবং মনিটরিং কমিটির যাচাই-বাছাই কতটা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে, তা নিয়ে চৌগাছায় প্রশ্ন উঠেছে।

বিশেষ করে বিদ্যালয়ের ঘরকে গুদাম হিসেবে দেখানোর অভিযোগ এবং একই ঘর একাধিক আবেদনকারীর নামে দেখানোর বিষয়টি তদন্তের দাবি জোরালো করেছে।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, নিয়োগের চূড়ান্ত তালিকা কে তৈরি করেছেন, কোন মানদণ্ডে আবেদনকারীদের বাছাই করা হয়েছে এবং গুদাম যাচাইয়ের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা কী প্রতিবেদন দিয়েছেন?

অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম, তথ্য গোপন বা নীতিমালা লঙ্ঘন পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সচেতন নাগরিকরা।