ঢাকা ০৬:৫০ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাতিল হচ্ছে বাংলা, ইতিহাস ও দর্শনের অনার্স কোর্স

দর্পণ ডেক্স
  • আপডেট সময় : ১১:৪১:৪০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬
  • / ৮৬ বার পঠিত

দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও কর্মমুখী ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে ব্যাপক সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নতুন খসড়া মডেল অনুযায়ী উচ্চশিক্ষায় বাংলা, ইতিহাস, দর্শনসহ প্রায় ছয়টি বিষয়ের অনার্স কোর্স বাতিল করে সেগুলোকে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে সমন্বয় করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষার পরিধি বাড়িয়ে পাঠ্যক্রমে যুক্ত করা হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সাইবার সিকিউরিটি, আউটসোর্সিং এবং অন্যান্য প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতাভিত্তিক বিষয়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের সংযোগ জোরদার করাই এই সংস্কারের মূল লক্ষ্য। কলেজ পর্যায়েই চালু করা হবে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ, প্রতিষ্ঠা করা হবে ক্যারিয়ার সেন্টার এবং শিক্ষার্থীদের জন্য সাতটি বিদেশি ভাষা শেখার সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে এখনও আলোচনা চলছে এবং সংশ্লিষ্ট সবার মতামত নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন দেশের সনদনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তে দক্ষতা, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থানভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার বিষয়ে নির্দেশনা পান।

এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, “আমরা এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, যেখানে শুধু ডিগ্রি অর্জন নয়, বরং দক্ষ ও কর্মক্ষম মানবসম্পদ তৈরি হবে।”

শিক্ষাবিদদের মতে, দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা কর্মসংস্থানের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ স্থাপন করতে পারছে না। ফলে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে দেশের প্রায় ৮৫ শতাংশ কর্মসংস্থান অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে হওয়ায় দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে।

অন্যদিকে, শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ কমাতে এবং স্কুল-কলেজে স্বাভাবিক পাঠদান নিশ্চিত করতে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার কাঠামোতেও পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা করছে সরকার। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) ইতোমধ্যে এ-সংক্রান্ত একটি প্রাথমিক কর্মপরিকল্পনা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে এসএসসি পরীক্ষা শেষ করতে ২৫ থেকে ৩০ কর্মদিবস এবং এইচএসসি পরীক্ষা শেষ করতে ৩০ থেকে ৩৫ কর্মদিবস বা তারও বেশি সময় লাগে। ফলে দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পরীক্ষা কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হয় এবং অন্যান্য শ্রেণির শিক্ষার্থীদের শিখনঘণ্টা কমে যায়। দীর্ঘ পরীক্ষাকাল পরীক্ষার্থীদের ওপরও মানসিক চাপ সৃষ্টি করে।

এদিকে সরকার ২০২৮ সাল থেকে নতুন শিক্ষাক্রম চালুর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। নতুন শিক্ষাক্রমে ক্রীড়া ও সংস্কৃতি বিষয়ে দুটি নতুন বিষয় চতুর্থ শ্রেণি থেকে এবং ‘কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা’ ও ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ নামে আরও দুটি বিষয় ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। পাশাপাশি বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় ভাষা শিক্ষার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হবে।

সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, “২০২৭ সালে বিদ্যমান শিক্ষাক্রমকে বাস্তবতার আলোকে পরিমার্জন করা হবে। আর ২০২৮ সালে নতুন শিক্ষাক্রমের পূর্ণাঙ্গ রূপ বাস্তবায়ন করা হবে।”

প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিনও নতুন শিক্ষাক্রমে প্রয়োজনীয় সংযোজন, বিয়োজন ও পরিমার্জনের পাশাপাশি চারটি নতুন বিষয় যুক্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এদিকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ও সনদনির্ভর শিক্ষা থেকে বেরিয়ে দক্ষতা ও কর্মসংস্থানকেন্দ্রিক উচ্চশিক্ষা গড়ে তুলতে বড় ধরনের সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ বলেন, শিক্ষার্থীদের যুগোপযোগী দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নানা উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বাস্তবমুখী ও প্রযুক্তিনির্ভর এই শিক্ষা সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের তরুণদের দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলা এবং কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে।

ট্যাগস :

বাতিল হচ্ছে বাংলা, ইতিহাস ও দর্শনের অনার্স কোর্স

আপডেট সময় : ১১:৪১:৪০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬

দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও কর্মমুখী ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে ব্যাপক সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নতুন খসড়া মডেল অনুযায়ী উচ্চশিক্ষায় বাংলা, ইতিহাস, দর্শনসহ প্রায় ছয়টি বিষয়ের অনার্স কোর্স বাতিল করে সেগুলোকে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে সমন্বয় করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষার পরিধি বাড়িয়ে পাঠ্যক্রমে যুক্ত করা হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সাইবার সিকিউরিটি, আউটসোর্সিং এবং অন্যান্য প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতাভিত্তিক বিষয়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের সংযোগ জোরদার করাই এই সংস্কারের মূল লক্ষ্য। কলেজ পর্যায়েই চালু করা হবে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ, প্রতিষ্ঠা করা হবে ক্যারিয়ার সেন্টার এবং শিক্ষার্থীদের জন্য সাতটি বিদেশি ভাষা শেখার সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে এখনও আলোচনা চলছে এবং সংশ্লিষ্ট সবার মতামত নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন দেশের সনদনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তে দক্ষতা, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থানভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার বিষয়ে নির্দেশনা পান।

এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, “আমরা এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, যেখানে শুধু ডিগ্রি অর্জন নয়, বরং দক্ষ ও কর্মক্ষম মানবসম্পদ তৈরি হবে।”

শিক্ষাবিদদের মতে, দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা কর্মসংস্থানের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ স্থাপন করতে পারছে না। ফলে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে দেশের প্রায় ৮৫ শতাংশ কর্মসংস্থান অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে হওয়ায় দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে।

অন্যদিকে, শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ কমাতে এবং স্কুল-কলেজে স্বাভাবিক পাঠদান নিশ্চিত করতে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার কাঠামোতেও পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা করছে সরকার। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) ইতোমধ্যে এ-সংক্রান্ত একটি প্রাথমিক কর্মপরিকল্পনা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে এসএসসি পরীক্ষা শেষ করতে ২৫ থেকে ৩০ কর্মদিবস এবং এইচএসসি পরীক্ষা শেষ করতে ৩০ থেকে ৩৫ কর্মদিবস বা তারও বেশি সময় লাগে। ফলে দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পরীক্ষা কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হয় এবং অন্যান্য শ্রেণির শিক্ষার্থীদের শিখনঘণ্টা কমে যায়। দীর্ঘ পরীক্ষাকাল পরীক্ষার্থীদের ওপরও মানসিক চাপ সৃষ্টি করে।

এদিকে সরকার ২০২৮ সাল থেকে নতুন শিক্ষাক্রম চালুর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। নতুন শিক্ষাক্রমে ক্রীড়া ও সংস্কৃতি বিষয়ে দুটি নতুন বিষয় চতুর্থ শ্রেণি থেকে এবং ‘কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা’ ও ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ নামে আরও দুটি বিষয় ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। পাশাপাশি বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় ভাষা শিক্ষার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হবে।

সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, “২০২৭ সালে বিদ্যমান শিক্ষাক্রমকে বাস্তবতার আলোকে পরিমার্জন করা হবে। আর ২০২৮ সালে নতুন শিক্ষাক্রমের পূর্ণাঙ্গ রূপ বাস্তবায়ন করা হবে।”

প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিনও নতুন শিক্ষাক্রমে প্রয়োজনীয় সংযোজন, বিয়োজন ও পরিমার্জনের পাশাপাশি চারটি নতুন বিষয় যুক্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এদিকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ও সনদনির্ভর শিক্ষা থেকে বেরিয়ে দক্ষতা ও কর্মসংস্থানকেন্দ্রিক উচ্চশিক্ষা গড়ে তুলতে বড় ধরনের সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ বলেন, শিক্ষার্থীদের যুগোপযোগী দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নানা উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বাস্তবমুখী ও প্রযুক্তিনির্ভর এই শিক্ষা সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের তরুণদের দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলা এবং কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে।