৪০০ বস্তা ইউরিয়া সরবরাহ নিয়ে প্রশ্ন!
যশোরে কৃত্রিম সার সংকটে কৃষকদের ভোগান্তি
- আপডেট সময় : ০৮:৩৯:০০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ২২ বার পঠিত

আমনের ভরা মৌসুমে যশোরে সার সংকট নিয়ে কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কমে যাওয়া এবং এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে সার মজুদের অভিযোগে মাঠপর্যায়ে সংকট আরও তীব্র হয়েছে বলে দাবি কৃষকদের। সরকারি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে প্রতি বস্তা সারে কয়েকশ টাকা বেশি নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। ফলে সময়মতো সার না পাওয়ায় চাষাবাদ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।
কৃষকদের অভিযোগ, ডিলারদের কাছে গিয়েও অনেক সময় সহজে সার পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে সরকারি হিসাব ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, যশোরে ইউরিয়া, টিএসপি ও ডিএপি সারের বরাদ্দ আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে। আমন মৌসুমে জমিতে প্রয়োজনীয় সময়ে সার প্রয়োগ করতে না পারলে উৎপাদনে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ সংকট মোকাবিলা এবং অবৈধ মজুদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন উপজেলায় অভিযান পরিচালনা করেছে। চৌগাছা ও মণিরামপুরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে সার জব্দ ও জরিমানার ঘটনাও ঘটেছে। তবে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কাগজে-কলমে বড় ধরনের সংকট না থাকার কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে কৃষকদের ভোগান্তির চিত্র ভিন্ন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, যশোর সদর, কেশবপুর, মণিরামপুর, বাঘারপাড়া, ঝিকরগাছা, চৌগাছা ও শার্শা উপজেলার কিছু ডিলার ও সাব-ডিলার পর্যাপ্ত পরিমাণ সার গুদামে মজুদ করে রেখেছেন। কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে বেশি মুনাফার আশায় কেউ কেউ সার আটকে রাখছেন বলেও কৃষকদের অভিযোগ। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি ও তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
এদিকে মণিরামপুরের খেদাপাড়ায় ‘চার ভাই এন্টারপ্রাইজ’-এর স্বত্বাধিকারী রাজু আহমেদের প্রতিষ্ঠানে ৪০০ বস্তা ইউরিয়া সার পাঠানো নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনীয় চালান ও প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই বিপুল পরিমাণ ইউরিয়া সার সেখানে পাঠানো হয়েছে।
জানা গেছে, চার ভাই এন্টারপ্রাইজের প্রতিষ্ঠানে আগে থেকেই প্রায় ৩০০ বস্তা সার মজুদ ছিল। এর মধ্যে নেহালপুর ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের নামে আরও ২০ টন বা ৪০০ বস্তা বিসিআইসি ইউরিয়া সার এনে সেখানে মজুদ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। একটি প্রতিষ্ঠানের নামে উত্তোলন করা সার অন্য প্রতিষ্ঠানে কী প্রক্রিয়ায় পাঠানো হয়েছে, এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় চালান ও কাগজপত্র ছিল কি না এবং সরকারি বিধিমালা অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়ে চার ভাই এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী রাজু আহমেদ বলেন, মণিরামপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জুনায়েদ ও বিসিআইসির উপ-সহকারী কর্মকর্তা দর্পণ তাকে সারগুলো নিতে বলেছিলেন।
রাজু আহমেদ বলেন, আমার এলাকায় ব্যবসায়ী হিসেবে ভালো পরিচিতি ও সুনাম রয়েছে। ব্যবসায়িক প্রয়োজন বিবেচনা করেই আমি সারগুলো গ্রহণ করেছি।
তিনি আরও বলেন, সার নেওয়ার সময় আমি দুই দিন পর টাকা পরিশোধ করার কথা জানিয়েছিলাম। এরপরও সংশ্লিষ্টরা আমাকে সার দিয়েছেন। মণিরামপুর বিসিআইসির উপ-সহকারী কর্মকর্তা দর্পণের পরামর্শ অনুযায়ী এবং তাদের দেওয়া সার হিসেবেই আমি তা গ্রহণ করেছি। এখানে আমার পক্ষ থেকে কোনো অনিয়ম করার উদ্দেশ্য ছিল না।
তবে একসঙ্গে ৪০০ বস্তা সার অন্য এলাকায় বা প্রতিষ্ঠানে সরবরাহের সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে জানিয়েছেন যশোর সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাজিয়া সুলতানা। তিনি বলেন, কোনো এলাকায় বা কোনো ব্যবসায়ীর সারের সংকট দেখা দিলে প্রয়োজন অনুযায়ী অফিস বা সংশ্লিষ্ট ডিলারের কাছ থেকে সীমিত পরিমাণ সার নিয়ে এক ইউনিয়ন থেকে অন্য ইউনিয়নের ডিলারকে সহযোগিতা করার সুযোগ থাকতে পারে। তবে এর পরিমাণ সাধারণত ১০, ২০ বা ২৫ বস্তার মতো হতে পারে।
রাজিয়া সুলতানা বলেন, ২০ টন বা ৪০০ বস্তা সার নেওয়ার বিষয়টি আমার জানা নেই। কোনো এলাকায় বা ব্যবসায়ীর সারের সংকট হলে সে কিছু পরিমাণ সার অফিস থেকে বা ডিলারের কাছ থেকে নিয়ে বিক্রি করতে পারেন। তবে একসঙ্গে ৪০০ বস্তা সার নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
এদিকে বিসিআইসি সার গুদাম, যশোর অফিসের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, কোনো এলাকায় সারের জরুরি প্রয়োজন হলে পরিস্থিতি বিবেচনায় সীমিত পরিমাণে, যেমন ১০ থেকে ২০ বস্তা, সার নেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে। তবে একসঙ্গে ৪০০ বস্তা সার নেওয়ার বিষয়টি গ্রহণযোগ্য নয় বলে জানানো হয়েছে।
ফলে এক প্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দকৃত ৪০০ বস্তা ইউরিয়া কী প্রক্রিয়ায় অন্য প্রতিষ্ঠানে পৌঁছাল, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও চালান ছিল কি না এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনুমোদন বা নির্দেশনা ছিল কি না, এসব বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্তের দাবি উঠেছে।
কৃষকদের দাবি, আমন মৌসুমে সারের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, সরকারি মূল্যে সার বিক্রি নিশ্চিত করা এবং অবৈধ মজুদ বা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির অভিযোগে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। অন্যথায় সার সংকটের প্রভাব কৃষি উৎপাদনে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।




















