ঢাকা ০৪:৪০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬, ৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
তনু-আছিয়া-নুসরাত-রামিসা ধর্ষণ ও হত্যাকান্ড

মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর প্রশ্নে অনিশ্চয়তা!

রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসা আক্তারের ধর্ষণ ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দোষীদের দ্রুত বিচার কার্যকরের দাবি জোরালো হয়েছে। ইতোমধ্যে এ মামলায় আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্নাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। রায় ঘোষণার পর থেকেই দ্রুত দণ্ড কার্যকরের দাবি জানাচ্ছেন সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন।  বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং আইনি জটিলতার কারণে অতীতে ঘটে যাওয়া বহু আলোচিত অপরাধের বিচার দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত মাত্র চার মাসে দেশে অন্তত ১১৮ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ সময় ধর্ষণচেষ্টার পর হত্যার শিকার হয়েছে আরও ১৭ জন শিশু।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মতো কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, মামলার জট এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে ভুক্তভোগীরা দ্রুত বিচার পাচ্ছেন না।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ফৌজিয়া করিম ফিরোজ বলেন, বিচার ব্যবস্থার ধীরগতি ও জটিলতা অনেক ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রাপ্তিকে বিলম্বিত করছে, যা ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জন্য আরও কষ্টকর পরিস্থিতি তৈরি করছে।

সরকারি তথ্য ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ১৮ বছরে সংঘটিত একাধিক আলোচিত ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের মামলায় নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও উচ্চ আদালতের আপিল, ডেথ রেফারেন্স ও অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়ার কারণে অনেক রায় এখনো চূড়ান্তভাবে কার্যকর হয়নি।

এ ধরনের কয়েকটি আলোচিত মামলা হলো—

নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলা (২০১৯, ফেনী): মাদরাসাছাত্রী নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড হলেও হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স ও আপিল নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া দীর্ঘ সময় ধরে চলমান।

রসু খাঁ সিরিয়াল কিলিং মামলা (২০১১, চাঁদপুর): ১১ নারীকে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এই আসামির হাইকোর্টে রায় বহাল থাকলেও চূড়ান্ত কার্যকর হয়নি এবং তিনি কারাগারে বন্দি আছেন।

জাকিয়া সুলতানা রুপা হত্যা মামলা (২০১৭, টাঙ্গাইল): চলন্ত বাসে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় নিম্ন আদালতের মৃত্যুদণ্ডাদেশ পরে হাইকোর্টে আংশিকভাবে পরিবর্তিত হয়।

সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলা (২০১৬, কুমিল্লা): সেনানিবাস এলাকায় সংঘটিত এই আলোচিত হত্যা মামলাটি এক দশকেও চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে পৌঁছায়নি।

আছিয়া আক্তার হত্যা মামলা (২০২৫, মাগুরা): শিশু আছিয়াকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ড হলেও উচ্চ আদালতে আপিল প্রক্রিয়ার কারণে দণ্ড কার্যকর ঝুলে আছে।

আইন অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে হাইকোর্টের ডেথ রেফারেন্স অনুমোদন এবং আপিল বিভাগে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি সম্পন্ন করতে হয়। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন কারাগারে কয়েক হাজার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আপিল ও রিভিউ প্রক্রিয়ায় রয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত বিচার নিশ্চিতের পাশাপাশি আইনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়ানো না গেলে বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে জনঅসন্তোষ আরও বাড়তে পারে।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

তনু-আছিয়া-নুসরাত-রামিসা ধর্ষণ ও হত্যাকান্ড

মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর প্রশ্নে অনিশ্চয়তা!

আপডেট সময় : ০৪:১৩:৩৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ৭ জুন ২০২৬

রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসা আক্তারের ধর্ষণ ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দোষীদের দ্রুত বিচার কার্যকরের দাবি জোরালো হয়েছে। ইতোমধ্যে এ মামলায় আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্নাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। রায় ঘোষণার পর থেকেই দ্রুত দণ্ড কার্যকরের দাবি জানাচ্ছেন সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন।  বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং আইনি জটিলতার কারণে অতীতে ঘটে যাওয়া বহু আলোচিত অপরাধের বিচার দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত মাত্র চার মাসে দেশে অন্তত ১১৮ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ সময় ধর্ষণচেষ্টার পর হত্যার শিকার হয়েছে আরও ১৭ জন শিশু।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মতো কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, মামলার জট এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে ভুক্তভোগীরা দ্রুত বিচার পাচ্ছেন না।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ফৌজিয়া করিম ফিরোজ বলেন, বিচার ব্যবস্থার ধীরগতি ও জটিলতা অনেক ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রাপ্তিকে বিলম্বিত করছে, যা ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জন্য আরও কষ্টকর পরিস্থিতি তৈরি করছে।

সরকারি তথ্য ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ১৮ বছরে সংঘটিত একাধিক আলোচিত ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের মামলায় নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও উচ্চ আদালতের আপিল, ডেথ রেফারেন্স ও অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়ার কারণে অনেক রায় এখনো চূড়ান্তভাবে কার্যকর হয়নি।

এ ধরনের কয়েকটি আলোচিত মামলা হলো—

নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলা (২০১৯, ফেনী): মাদরাসাছাত্রী নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড হলেও হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স ও আপিল নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া দীর্ঘ সময় ধরে চলমান।

রসু খাঁ সিরিয়াল কিলিং মামলা (২০১১, চাঁদপুর): ১১ নারীকে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এই আসামির হাইকোর্টে রায় বহাল থাকলেও চূড়ান্ত কার্যকর হয়নি এবং তিনি কারাগারে বন্দি আছেন।

জাকিয়া সুলতানা রুপা হত্যা মামলা (২০১৭, টাঙ্গাইল): চলন্ত বাসে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় নিম্ন আদালতের মৃত্যুদণ্ডাদেশ পরে হাইকোর্টে আংশিকভাবে পরিবর্তিত হয়।

সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলা (২০১৬, কুমিল্লা): সেনানিবাস এলাকায় সংঘটিত এই আলোচিত হত্যা মামলাটি এক দশকেও চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে পৌঁছায়নি।

আছিয়া আক্তার হত্যা মামলা (২০২৫, মাগুরা): শিশু আছিয়াকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ড হলেও উচ্চ আদালতে আপিল প্রক্রিয়ার কারণে দণ্ড কার্যকর ঝুলে আছে।

আইন অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে হাইকোর্টের ডেথ রেফারেন্স অনুমোদন এবং আপিল বিভাগে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি সম্পন্ন করতে হয়। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন কারাগারে কয়েক হাজার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আপিল ও রিভিউ প্রক্রিয়ায় রয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত বিচার নিশ্চিতের পাশাপাশি আইনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়ানো না গেলে বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে জনঅসন্তোষ আরও বাড়তে পারে।