ঢাকা ০৩:১৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
দেখার যেন কেউ নেই !

ঈদফেরত যাত্রীবাহী বাস হতে ‘নানা খাতে’ টাকা আদায়

পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে ঘরমুখো মানুষের চাপ বেড়েছে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দৌলতদিয়া ঘাটে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত এ ঘাট দিয়ে প্রতিদিনের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি যানবাহন চলাচল করছে। তবে যাত্রী পরিবহনের এই ব্যস্ততাকে কেন্দ্র করে বাস থেকে বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।

বাসচালক ও সুপারভাইজারদের অভিযোগ, দৌলতদিয়া ঘাট বাস টার্মিনাল থেকে যাত্রী নিয়ে গন্তব্যে রওনা দিতে প্রতিটি বাসকে ‘ডিপার্সার’, ‘সিরিয়াল’ ও ‘কাউন্টার চার্জ’সহ বিভিন্ন নামে আড়াই থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। যদিও সংশ্লিষ্ট মালিক ও শ্রমিক নেতারা এসব অর্থকে চাঁদাবাজি নয়, বরং শ্রমিক কল্যাণ ও সাংগঠনিক ব্যয়ের জন্য আদায়কৃত অর্থ বলে দাবি করেছেন।

গত ২৭ মে বিকেলে দৌলতদিয়া বাস টার্মিনাল ঘুরে দেখা যায়, ঈদ উপলক্ষে অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহনের জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা শত শত বাস সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এসব বাসের চালক ও সুপারভাইজারদের অনেকেই অভিযোগ করেন, টার্মিনাল থেকে বের হওয়ার আগে তাদের একাধিক খাতে টাকা দিতে বাধ্য করা হয়।

বরিশাল থেকে যাত্রী নিতে আসা একটি বাসের সুপারভাইজার ইমন হোসেন বলেন, “এসব কথা বলে লাভ নেই, উল্টো শত্রু হতে হয়। আমরা যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া নিতে চাই না। কিন্তু দৌলতদিয়া থেকে যাত্রী নিয়ে বের হতে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা খরচ হয়ে যায়। সেই টাকা তো কোনো না কোনোভাবে সমন্বয় করতে হয়।”

যশোর থেকে আসা বাসচালক রিয়াজ শেখের ভাষ্য, “ঈদের সময় এখানে একটি সিন্ডিকেট কাজ করে। আমরা নিজেরা যাত্রী তুললেও কাউন্টার বাবদ কমপক্ষে দেড় হাজার টাকা দিতে হয়। ডিপার্সার ও সিরিয়াল বাবদ আরও প্রায় এক হাজার টাকা দিতে হয়। অতিরিক্ত যাত্রী থাকলে আলাদা খরচও আছে।”

খুলনা মেট্রো-ব ১১-০২৮২ নম্বর বাসের সুপারভাইজার হেলাল মোল্লা জানান, ফরিদপুর থেকে এসে যাত্রী তুলতে তাকে ৫০০ টাকা ডিপার্সার ফি দিতে হয়েছে। তিনি এ সময় একটি রসিদও দেখান।

ঢাকা মেট্রো-ব ১১-০০৩৪ নম্বর বাসের সুপারভাইজার সৈয়দ হোসেন বলেন, “সিরিয়াল, কাউন্টার ও ডিপার্সার মিলিয়ে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা খরচ হয়। এখানে এটাই অলিখিত নিয়ম।”

অন্যদিকে, ঢাকা মেট্রো-ব ১৪-৪৭০৭ নম্বর বাসের চালক হিমায়েত বলেন, “প্রতি ঈদেই অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়। বছর বছর সেই অঙ্কও বাড়ছে।”

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে দৌলতদিয়া বাস টার্মিনালে ডিপার্সার বাবদ টাকা সংগ্রহকারী রুহুল আমিন বলেন, “আমি শুধু ৫০০ টাকা ডিপার্সার নিই। এটি মালিক সমিতির নির্ধারিত টাকা। কেন নেওয়া হয়, সেটি সমিতি বলতে পারবে।”

রাজবাড়ী জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের সভাপতি খোন্দকার মাহমুদুল হক জুয়েল বলেন, “ডিপার্সার বাবদ যে অর্থ নেওয়া হয়, তা শ্রমিক কল্যাণ তহবিল ও বিভিন্ন সামাজিক কাজে ব্যয় করা হয়। কোনো বাস মালিকের এ বিষয়ে আপত্তি নেই। যাত্রীদের কাছ থেকেও সরাসরি এই টাকা নেওয়া হয় না।”

তিনি আরও বলেন, “ঈদের সময় অনেক মৌসুমি কাউন্টার গড়ে ওঠে। বহিরাগতরা বিপুল অর্থ আয় করলেও স্থানীয় শ্রমিকরা বঞ্চিত হন। এ কারণে সংগঠনের কিছু কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অর্থ সংগ্রহ করা হয়।”

এ বিষয়ে রাজবাড়ী জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন বলেন, “এ ধরনের কোনো অভিযোগ এখনো আমাদের কাছে আসেনি। কেউ লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ করলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

ঈদযাত্রাকে ঘিরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের এই অভিযোগ সত্য হলে এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত যাত্রীদের ওপরই পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ পরিবহন খাতের অতিরিক্ত ব্যয় অনেক ক্ষেত্রেই ভাড়া কিংবা অন্যান্য খরচের মাধ্যমে সাধারণ যাত্রীদের কাছ থেকেই আদায় করা হয়।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

দেখার যেন কেউ নেই !

ঈদফেরত যাত্রীবাহী বাস হতে ‘নানা খাতে’ টাকা আদায়

আপডেট সময় : ০৯:০৮:০৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১ জুন ২০২৬

পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে ঘরমুখো মানুষের চাপ বেড়েছে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দৌলতদিয়া ঘাটে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত এ ঘাট দিয়ে প্রতিদিনের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি যানবাহন চলাচল করছে। তবে যাত্রী পরিবহনের এই ব্যস্ততাকে কেন্দ্র করে বাস থেকে বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।

বাসচালক ও সুপারভাইজারদের অভিযোগ, দৌলতদিয়া ঘাট বাস টার্মিনাল থেকে যাত্রী নিয়ে গন্তব্যে রওনা দিতে প্রতিটি বাসকে ‘ডিপার্সার’, ‘সিরিয়াল’ ও ‘কাউন্টার চার্জ’সহ বিভিন্ন নামে আড়াই থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। যদিও সংশ্লিষ্ট মালিক ও শ্রমিক নেতারা এসব অর্থকে চাঁদাবাজি নয়, বরং শ্রমিক কল্যাণ ও সাংগঠনিক ব্যয়ের জন্য আদায়কৃত অর্থ বলে দাবি করেছেন।

গত ২৭ মে বিকেলে দৌলতদিয়া বাস টার্মিনাল ঘুরে দেখা যায়, ঈদ উপলক্ষে অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহনের জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা শত শত বাস সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এসব বাসের চালক ও সুপারভাইজারদের অনেকেই অভিযোগ করেন, টার্মিনাল থেকে বের হওয়ার আগে তাদের একাধিক খাতে টাকা দিতে বাধ্য করা হয়।

বরিশাল থেকে যাত্রী নিতে আসা একটি বাসের সুপারভাইজার ইমন হোসেন বলেন, “এসব কথা বলে লাভ নেই, উল্টো শত্রু হতে হয়। আমরা যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া নিতে চাই না। কিন্তু দৌলতদিয়া থেকে যাত্রী নিয়ে বের হতে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা খরচ হয়ে যায়। সেই টাকা তো কোনো না কোনোভাবে সমন্বয় করতে হয়।”

যশোর থেকে আসা বাসচালক রিয়াজ শেখের ভাষ্য, “ঈদের সময় এখানে একটি সিন্ডিকেট কাজ করে। আমরা নিজেরা যাত্রী তুললেও কাউন্টার বাবদ কমপক্ষে দেড় হাজার টাকা দিতে হয়। ডিপার্সার ও সিরিয়াল বাবদ আরও প্রায় এক হাজার টাকা দিতে হয়। অতিরিক্ত যাত্রী থাকলে আলাদা খরচও আছে।”

খুলনা মেট্রো-ব ১১-০২৮২ নম্বর বাসের সুপারভাইজার হেলাল মোল্লা জানান, ফরিদপুর থেকে এসে যাত্রী তুলতে তাকে ৫০০ টাকা ডিপার্সার ফি দিতে হয়েছে। তিনি এ সময় একটি রসিদও দেখান।

ঢাকা মেট্রো-ব ১১-০০৩৪ নম্বর বাসের সুপারভাইজার সৈয়দ হোসেন বলেন, “সিরিয়াল, কাউন্টার ও ডিপার্সার মিলিয়ে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা খরচ হয়। এখানে এটাই অলিখিত নিয়ম।”

অন্যদিকে, ঢাকা মেট্রো-ব ১৪-৪৭০৭ নম্বর বাসের চালক হিমায়েত বলেন, “প্রতি ঈদেই অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়। বছর বছর সেই অঙ্কও বাড়ছে।”

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে দৌলতদিয়া বাস টার্মিনালে ডিপার্সার বাবদ টাকা সংগ্রহকারী রুহুল আমিন বলেন, “আমি শুধু ৫০০ টাকা ডিপার্সার নিই। এটি মালিক সমিতির নির্ধারিত টাকা। কেন নেওয়া হয়, সেটি সমিতি বলতে পারবে।”

রাজবাড়ী জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের সভাপতি খোন্দকার মাহমুদুল হক জুয়েল বলেন, “ডিপার্সার বাবদ যে অর্থ নেওয়া হয়, তা শ্রমিক কল্যাণ তহবিল ও বিভিন্ন সামাজিক কাজে ব্যয় করা হয়। কোনো বাস মালিকের এ বিষয়ে আপত্তি নেই। যাত্রীদের কাছ থেকেও সরাসরি এই টাকা নেওয়া হয় না।”

তিনি আরও বলেন, “ঈদের সময় অনেক মৌসুমি কাউন্টার গড়ে ওঠে। বহিরাগতরা বিপুল অর্থ আয় করলেও স্থানীয় শ্রমিকরা বঞ্চিত হন। এ কারণে সংগঠনের কিছু কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অর্থ সংগ্রহ করা হয়।”

এ বিষয়ে রাজবাড়ী জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন বলেন, “এ ধরনের কোনো অভিযোগ এখনো আমাদের কাছে আসেনি। কেউ লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ করলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

ঈদযাত্রাকে ঘিরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের এই অভিযোগ সত্য হলে এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত যাত্রীদের ওপরই পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ পরিবহন খাতের অতিরিক্ত ব্যয় অনেক ক্ষেত্রেই ভাড়া কিংবা অন্যান্য খরচের মাধ্যমে সাধারণ যাত্রীদের কাছ থেকেই আদায় করা হয়।