বাবার ইউনিফর্মে খেলতে খেলতেই স্বপ্ন
৪৭তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে প্রথম কেশবপুরের বাচ্চু রহমান
- আপডেট সময় : ০২:৪১:৪৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬
- / ৫৫ বার পঠিত

ছোটবেলায় বাবার আনসার বাহিনীর ইউনিফর্ম, বুট আর বেল্ট পরে খেলতেন। তখন হয়তো বুঝতেন না দায়িত্ব কত বড়, কিন্তু সেই পোশাকই একসময় তাঁর মনে গেঁথে দেয় পুলিশ কর্মকর্তা হওয়ার স্বপ্ন। বহু বছরের অধ্যবসায়, ব্যর্থতার তিক্ত অভিজ্ঞতা আর অদম্য আত্মবিশ্বাসের পথ পেরিয়ে সেই স্বপ্নই আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে। ৪৭তম বিসিএস পরীক্ষায় পুলিশ ক্যাডারে প্রথম হয়েছেন যশোরের কেশবপুর উপজেলার কানাইডাঙ্গা গ্রামের সন্তান বাচ্চু রহমান।
গত ২৮ জুন প্রকাশিত ৪৭তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফলে এই সাফল্য আসে। এর আগে ৪৫তম বিসিএসে প্রিলিমিনারি পরীক্ষাতেই বাদ পড়েছিলেন তিনি। তবে ব্যর্থতাকে শেষ নয়, নতুন শুরুর প্রেরণা হিসেবে নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ৪৯তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশ পাওয়ার পর এবার কাঙ্ক্ষিত পুলিশ ক্যাডারে প্রথম হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। তাঁর এই সাফল্যে কেশবপুরজুড়ে বইছে আনন্দের আমেজ।
বাচ্চু রহমান আনসার সদস্য নজরুল ইসলাম ও গৃহিণী বিলকিস বেগম দম্পতির দুই সন্তানের মধ্যে ছোট। সীমিত আয়ের সংসারে সন্তানদের পড়াশোনা করাতে বাবাকে করতে হয়েছে নিরন্তর সংগ্রাম। সেই সংগ্রামের প্রতিদান আজ দিয়েছেন ছেলে।
বাচ্চু ২০১৫ সালে কানাইডাঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়ে এসএসসি পাস করেন। এরপর পাঁজিয়া মহাবিদ্যালয় থেকে ২০১৭ সালে এইচএসসি সম্পন্ন করে ২০১৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই তাঁর স্বপ্ন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বাচ্চুর মা বিলকিস বেগম বলেন, “অনেক অভাব-অনটনের মধ্যেও ওদের লেখাপড়া বন্ধ হতে দিইনি। ওর বাবার চাকরির প্রায় পুরো টাকাই ছেলেদের পড়াশোনায় খরচ হয়েছে। ছোটবেলায় বাচ্চু খুব একটা পড়াশোনামুখী ছিল না। তবে জেএসসি পরীক্ষার পর থেকেই বইয়ের প্রতি ওর আগ্রহ বাড়তে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ও অনেক কষ্ট করেছে। আজ সেই কষ্টেরই পুরস্কার পেয়েছে। পুরো গ্রাম আজ খুশি।”
কানাইডাঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুস সবুর বলেন, “প্রত্যন্ত গ্রামের একজন শিক্ষার্থীর এমন সাফল্য আমাদের জন্য গর্বের। বাচ্চু সব সময় বিনয়ী ও মেধাবী ছিল। তার অর্জন প্রমাণ করে, সঠিক পরিকল্পনা, ধৈর্য ও কঠোর পরিশ্রম থাকলে বড় স্বপ্নও অর্জন করা সম্ভব।”
নিজের স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে বাচ্চু রহমান জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরই তিনি জানতে পারেন, বিসিএসের মাধ্যমে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) হওয়া যায়। তখন থেকেই পুলিশ ক্যাডারে যোগ দেওয়ার লক্ষ্য স্থির করেন।
তিনি বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় নিয়মিত পত্রিকা পড়তাম। নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, মাদক ও সাইবার অপরাধের খবর আমাকে খুব নাড়া দিত। তখন থেকেই মনে হয়েছে, এসব অপরাধ প্রতিরোধে কাজ করতে চাই। সেই ভাবনা থেকেই পুলিশ ক্যাডারের প্রতি আগ্রহ আরও বেড়ে যায়।”
পুলিশ ক্যাডার বেছে নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “মানুষের সবচেয়ে কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ পুলিশ পেশায় সবচেয়ে বেশি। আমি পদ বা ক্ষমতার জন্য নয়, একজন সৎ, দক্ষ ও মানবিক পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করতে চাই। মানুষ যেন বিপদে পড়ে পুলিশের কাছে এসে আস্থা ও ভরসা পায়—এটাই আমার লক্ষ্য। সততার সঙ্গে দেশের মানুষের সেবা করতে পারাই হবে আমার সবচেয়ে বড় অর্জন।”
কেশবপুরের প্রত্যন্ত গ্রামের এই তরুণের সাফল্য এখন শুধু তাঁর পরিবারের নয়, পুরো এলাকার গর্ব। সীমিত সামর্থ্যের একটি পরিবার থেকে উঠে এসে দেশের অন্যতম প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় পুলিশ ক্যাডারে প্রথম হওয়ার এই অর্জন নতুন প্রজন্মের কাছে অধ্যবসায়, ধৈর্য ও স্বপ্নপূরণের এক অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে থাকবে।






















