ঢাকা ০৫:০০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo আলিপুরে চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় সামির সোয়েব রাদমি Logo শার্শায় ধানক্ষেত থেকে ওয়ান শুটার পিস্তল উদ্ধার Logo যশোরে নবনির্মিত ভূমি অফিস উদ্বোধন করলেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী Logo সান্তাহারে ভক্তিবেদান্ত গীতা নিকেতনের বর্ষপূর্তি উৎসব পালন Logo এস এফ ট্রাভেলসের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে হজ্ব প্রতারণার অভিযোগ Logo অবৈধ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের রমরমা বাণিজ্য। Logo কেশবপুরে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস সিজন-২ এর উদ্বোধন Logo রাঙামাটিতে সওজ’র জমি দখল করে স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ Logo খুলনার জাহাঙ্গীর হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি গ্রেপ্তার Logo মসজিদে মসজিদে জায়নামাজ উপহার দিলেন চেয়ারম্যান প্রার্থী শামীম

রাঙামাটিতে সওজ’র জমি দখল করে স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ

রাঙামাটি সংবাদদাতা
  • আপডেট সময় : ০২:২৯:৩৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬
  • / ২০ বার পঠিত

রাঙামাটি শহরের ভেদভেদী ফাস্ট লাইন এলাকায় সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের সরকারি জমি দখল করে দোকানঘর ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। ভেদভেদী পশ্চিম মুসলিম পাড়া সমাজ উন্নয়ন কমিটির নাম ব্যবহার করে মাদ্রাসা ও এবাদতখানা নির্মাণের আড়ালে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সরকারি জমি দখলের চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এ ঘটনায় বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও সামনে এসেছে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

সওজের পক্ষ থেকে রাঙামাটি কোতোয়ালি থানায় করা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং লিখিত অভিযোগে সরকারি জমি দখল, কর্মচারীদের আবাসন ভাঙচুর, গাছ কাটা ও নতুন স্থাপনা নির্মাণের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগের ভিত্তিতে আদালতের অনুমতি নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।

সরকারি কোয়ার্টার ভেঙে স্থাপনা নির্মাণসওজ সূত্রে জানা গেছে, ভেদভেদী এলাকায় ফাস্ট লাইন ওয়ার্কশপের অধীন সরকারি জমি দীর্ঘদিন ধরে বিভাগের কর্মচারীদের আবাসন হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সম্প্রতি ওই জমির একাংশ দখল করে দোকানঘর ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। জমির গাছ কেটে চারপাশে টিনের বেড়া দেওয়া হয়েছে। ভেতরে থাকা কর্মচারীদের জন্য নির্মিত স্টাফ কোয়ার্টার ও ব্যারাকঘর ভেঙে নতুন স্থাপনা নির্মাণের কাজ চলছে বলেও অভিযোগ।

সওজের সার্ভেয়ার মোহাম্মদ আফজাল হোসাইন বিভাগের পক্ষে রাঙামাটি কোতোয়ালি থানায় জিডি করেন। জিডি নম্বর-১৫৭৩, তারিখ ২৯ অক্টোবর ২০২৬। এতে প্রাথমিকভাবে আলা উদ্দীন জয়, আফসার, জসিম খান, অন্তু দাশ ও মিজানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।জিডিতে বলা হয়, গত ২৮ অক্টোবর রাতে সওজের স্টাফ কোয়ার্টারে প্রবেশ করে কর্মচারীদের জন্য নির্মিত ব্যারাক ভেঙে ফেলা হয়। সরকারি জমির একাংশ দখল করে দোকানঘর ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। রাতের আঁধারে নির্মাণকাজ চালানোর অভিযোগও রয়েছে।কর্মকর্তাদের বাধা ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ

সওজের উপসহকারী প্রকৌশলী রনেন চাকমার অভিযোগ, গত ২৭ অক্টোবর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. রাহাত আলমের নেতৃত্বে কর্মকর্তারা অবৈধ দখলে বাধা দিতে গেলে তাঁদের হুমকি ও হয়রানির শিকার হতে হয়। সওজের কর্মচারীদের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় এবং ঘটনাটি মোবাইল ফোনে ধারণ করতে গেলে বাধা দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।এ ঘটনায় সরকারি ভূমি আত্মসাতের অভিযোগ এনে ২৭ অক্টোবর রাঙামাটি কোতোয়ালি থানায় অভিযোগ দায়ের করেন উপসহকারী প্রকৌশলী রনেন চাকমা।
এর আগে ২৬ অক্টোবর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. রাহাত আলম স্বাক্ষরিত একটি অফিসিয়াল পত্রে সরকারি জমি জবরদখল করে দোকানঘর ও স্থাপনা নির্মাণ এবং ভূমি আত্মসাতের অভিযোগ তুলে রাঙামাটি সদর জোন কমান্ডার, সহকারী কমিশনার (ভূমি)সহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক দপ্তরে ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরও জমি দখলের অভিযোগ, সওজের সরকারি জমি দখলের অভিযোগ অনুসন্ধান করতে গিয়ে অবসরপ্রাপ্ত এক নাইট গার্ড ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি দখল এবং বিক্রির অভিযোগ সামনে এসেছে।স্থানীয়দের অভিযোগ, সওজের পানির পাম্প মেশিনঘরের নাইট গার্ড এবং পরবর্তীতে ফাস্ট লাইন অফিস ও ওয়ার্কশপের অবসরপ্রাপ্ত নাইট গার্ড সাইদুল হক বাদশা দীর্ঘদিন ধরে ভেদভেদী, টিভি সেন্টার, শিমুলতলী, রেডিও সেন্টার, ইকোলজিক্যাল পার্ক, সিএন্ডবি গোডাউন, লোকনাথ মন্দিরের পেছনের এলাকা এবং ফাস্ট লাইন ওয়ার্কশপের আশপাশের জমি দখলের সঙ্গে জড়িত।

স্থানীয়দের দাবি, এসব জমি দখল করে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বিক্রি ও ভাড়া দেওয়ার মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। মাদ্রাসা, এবাদতখানা ও তৈয়বীয়া জামে মসজিদের নাম ব্যবহার করেও সরকারি জমি দখল ও বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ২০০২ সালে সাবেক ক্রীড়া সংগঠক ও বিএনপির জেলা কমিটির উপদেষ্টা আব্দুল মতিনের জায়গা পাহারা দেওয়ার নামে সেখানে ঘর নির্মাণ করে পরে জমি বিক্রির অভিযোগ রয়েছে সাইদুল হক বাদশার বিরুদ্ধে।

এ নিয়ে মামলা চলমান রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।অন্যদিকে, বিএনপির অফিস কাম ক্লাব নির্মাণের নামে জায়গা দখল, স্কুলের জায়গা ব্যবহারের কথা বলে জমি বিক্রি এবং ইকোলজিক্যাল পার্ক ও সিএন্ডবি গোডাউনের পেছনের জমি দখলের অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র যাচাই প্রয়োজন।

রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে জমি দখলের অভিযোগস্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযুক্তদের মধ্যে কয়েকজন বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী হিসেবে পরিচিত। তাঁদের মধ্যে সাইদুল হক বাদশা ভেদভেদী পশ্চিম মুসলিম পাড়া সমাজ উন্নয়ন কমিটির সভাপতি ও ৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি হিসেবে পরিচিত।

এ ছাড়া মো. আফসার যুবদলের সঙ্গে, মো. আলা উদ্দীন জয় ছাত্রদলের সঙ্গে, অনতোষ দাশ স্বেচ্ছাসেবক দলের সঙ্গে এবং মো. মিজানুর রহমান যুবদলের সঙ্গে যুক্ত বলে স্থানীয়ভাবে পরিচিতি রয়েছে। জসিম খাঁ ও মো. করিমের বিরুদ্ধেও রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে জমি দখলের অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয়দের দাবি, দলীয় পরিচয় ও প্রভাব ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে একটি চক্র বিভিন্ন সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি দখলের চেষ্টা করছে। তবে রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেই কেউ অপরাধে জড়িত,এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই; অভিযোগগুলোর আইনগত তদন্ত প্রয়োজন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, সওজের জমিতে থাকা শিশু, বেল ও কাঁঠালগাছ কেটে চারপাশে টিনের বেড়া দেওয়া হয়েছে। ভেতরে কর্মচারীদের আবাসন বা ব্যারাকঘর ভেঙে নতুনভাবে নির্মাণকাজ চলছে। বাইরে মাদ্রাসার কাজ চলছে উল্লেখ করে একটি সাইনবোর্ড টাঙানো রয়েছে।সওজের দাবি, সরকারি জমি অবৈধভাবে দখল করে দোকান নির্মাণ করা হচ্ছে এবং এসব দোকান সালামির বিনিময়ে ভাড়া দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা সংগ্রহের অভিযোগও রয়েছে।

এ বিষয়ে ভেদভেদী পশ্চিম মুসলিম পাড়া সমাজ উন্নয়ন কমিটির সাধারণ সম্পাদক আলা উদ্দীন জয় অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “জায়গাটি সড়ক বিভাগের সরকারি জমি নয়। মাদ্রাসার নামে সব কাগজপত্র রয়েছে। আমিই মাদ্রাসার সাইনবোর্ড লাগিয়েছি।তিনি দাবি করেন, ওই জায়গায় অস্ট্রেলিয়ার একটি কোম্পানি কর্মীদের আবাসনের জন্য ভবন নির্মাণ করেছিল। সড়ক বিভাগ সেখানে কোনো আবাসন নির্মাণ করেনি। তবে ওই এলাকায় সড়ক বিভাগের ১ দশমিক ৭৫ একর জমি রয়েছে বলেও জানান তিনি।

রাঙামাটি সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ চাকমা বলেন, ভেদভেদী এলাকায় মসজিদ ও মাদ্রাসার নামে সরকারি জমি দখলের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এ ঘটনায় ভূমিদস্যুরা সওজের কর্মচারীদের প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছে। প্রতিকার চেয়ে কোতোয়ালি থানায় জিডি করা হয়েছে। জিডি তদন্তের জন্য আদালতের অনুমতি পাওয়া গেছে।

তিনি জানান, বিষয়টি রাঙামাটি সদর জোন কমান্ডার, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)সহ প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে জানানো হয়েছে। জেলা বিএনপির সভাপতি ও রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দীপন তালুকদার দীপু এবং জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফুল ইসলাম শাকিলকেও তিনি অবৈধ স্থাপনার ছবি পাঠিয়ে বিষয়টি অবহিত করেছেন বলে দাবি করেন।

রাঙামাটি কোতোয়ালি থানার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই (নিরস্ত্র) আমজাদূর রহমান বলেন, সড়ক বিভাগের সরকারি জমি দখলের অভিযোগে জিডি হয়েছে। বিষয়টি তদন্তের জন্য আদালত অনুমতি দিয়েছেন। আমরা তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছি।

সরকারি জমি দখল, কর্মচারীদের আবাসন ভাঙচুর এবং মাদ্রাসা ও এবাদতখানার নামে জমি ব্যবহারের অভিযোগ ঘিরে ভেদভেদী এলাকায় এখন নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সরকারি জমির প্রকৃত সীমানা নির্ধারণ, মালিকানা যাচাই, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের সত্যতা এবং অভিযোগে উল্লিখিত ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছেন এলাকাবাসী।

ট্যাগস :

রাঙামাটিতে সওজ’র জমি দখল করে স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ

আপডেট সময় : ০২:২৯:৩৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬

রাঙামাটি শহরের ভেদভেদী ফাস্ট লাইন এলাকায় সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের সরকারি জমি দখল করে দোকানঘর ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। ভেদভেদী পশ্চিম মুসলিম পাড়া সমাজ উন্নয়ন কমিটির নাম ব্যবহার করে মাদ্রাসা ও এবাদতখানা নির্মাণের আড়ালে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সরকারি জমি দখলের চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এ ঘটনায় বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও সামনে এসেছে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

সওজের পক্ষ থেকে রাঙামাটি কোতোয়ালি থানায় করা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং লিখিত অভিযোগে সরকারি জমি দখল, কর্মচারীদের আবাসন ভাঙচুর, গাছ কাটা ও নতুন স্থাপনা নির্মাণের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগের ভিত্তিতে আদালতের অনুমতি নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।

সরকারি কোয়ার্টার ভেঙে স্থাপনা নির্মাণসওজ সূত্রে জানা গেছে, ভেদভেদী এলাকায় ফাস্ট লাইন ওয়ার্কশপের অধীন সরকারি জমি দীর্ঘদিন ধরে বিভাগের কর্মচারীদের আবাসন হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সম্প্রতি ওই জমির একাংশ দখল করে দোকানঘর ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। জমির গাছ কেটে চারপাশে টিনের বেড়া দেওয়া হয়েছে। ভেতরে থাকা কর্মচারীদের জন্য নির্মিত স্টাফ কোয়ার্টার ও ব্যারাকঘর ভেঙে নতুন স্থাপনা নির্মাণের কাজ চলছে বলেও অভিযোগ।

সওজের সার্ভেয়ার মোহাম্মদ আফজাল হোসাইন বিভাগের পক্ষে রাঙামাটি কোতোয়ালি থানায় জিডি করেন। জিডি নম্বর-১৫৭৩, তারিখ ২৯ অক্টোবর ২০২৬। এতে প্রাথমিকভাবে আলা উদ্দীন জয়, আফসার, জসিম খান, অন্তু দাশ ও মিজানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।জিডিতে বলা হয়, গত ২৮ অক্টোবর রাতে সওজের স্টাফ কোয়ার্টারে প্রবেশ করে কর্মচারীদের জন্য নির্মিত ব্যারাক ভেঙে ফেলা হয়। সরকারি জমির একাংশ দখল করে দোকানঘর ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। রাতের আঁধারে নির্মাণকাজ চালানোর অভিযোগও রয়েছে।কর্মকর্তাদের বাধা ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ

সওজের উপসহকারী প্রকৌশলী রনেন চাকমার অভিযোগ, গত ২৭ অক্টোবর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. রাহাত আলমের নেতৃত্বে কর্মকর্তারা অবৈধ দখলে বাধা দিতে গেলে তাঁদের হুমকি ও হয়রানির শিকার হতে হয়। সওজের কর্মচারীদের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় এবং ঘটনাটি মোবাইল ফোনে ধারণ করতে গেলে বাধা দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।এ ঘটনায় সরকারি ভূমি আত্মসাতের অভিযোগ এনে ২৭ অক্টোবর রাঙামাটি কোতোয়ালি থানায় অভিযোগ দায়ের করেন উপসহকারী প্রকৌশলী রনেন চাকমা।
এর আগে ২৬ অক্টোবর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. রাহাত আলম স্বাক্ষরিত একটি অফিসিয়াল পত্রে সরকারি জমি জবরদখল করে দোকানঘর ও স্থাপনা নির্মাণ এবং ভূমি আত্মসাতের অভিযোগ তুলে রাঙামাটি সদর জোন কমান্ডার, সহকারী কমিশনার (ভূমি)সহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক দপ্তরে ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরও জমি দখলের অভিযোগ, সওজের সরকারি জমি দখলের অভিযোগ অনুসন্ধান করতে গিয়ে অবসরপ্রাপ্ত এক নাইট গার্ড ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি দখল এবং বিক্রির অভিযোগ সামনে এসেছে।স্থানীয়দের অভিযোগ, সওজের পানির পাম্প মেশিনঘরের নাইট গার্ড এবং পরবর্তীতে ফাস্ট লাইন অফিস ও ওয়ার্কশপের অবসরপ্রাপ্ত নাইট গার্ড সাইদুল হক বাদশা দীর্ঘদিন ধরে ভেদভেদী, টিভি সেন্টার, শিমুলতলী, রেডিও সেন্টার, ইকোলজিক্যাল পার্ক, সিএন্ডবি গোডাউন, লোকনাথ মন্দিরের পেছনের এলাকা এবং ফাস্ট লাইন ওয়ার্কশপের আশপাশের জমি দখলের সঙ্গে জড়িত।

স্থানীয়দের দাবি, এসব জমি দখল করে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বিক্রি ও ভাড়া দেওয়ার মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। মাদ্রাসা, এবাদতখানা ও তৈয়বীয়া জামে মসজিদের নাম ব্যবহার করেও সরকারি জমি দখল ও বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ২০০২ সালে সাবেক ক্রীড়া সংগঠক ও বিএনপির জেলা কমিটির উপদেষ্টা আব্দুল মতিনের জায়গা পাহারা দেওয়ার নামে সেখানে ঘর নির্মাণ করে পরে জমি বিক্রির অভিযোগ রয়েছে সাইদুল হক বাদশার বিরুদ্ধে।

এ নিয়ে মামলা চলমান রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।অন্যদিকে, বিএনপির অফিস কাম ক্লাব নির্মাণের নামে জায়গা দখল, স্কুলের জায়গা ব্যবহারের কথা বলে জমি বিক্রি এবং ইকোলজিক্যাল পার্ক ও সিএন্ডবি গোডাউনের পেছনের জমি দখলের অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র যাচাই প্রয়োজন।

রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে জমি দখলের অভিযোগস্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযুক্তদের মধ্যে কয়েকজন বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী হিসেবে পরিচিত। তাঁদের মধ্যে সাইদুল হক বাদশা ভেদভেদী পশ্চিম মুসলিম পাড়া সমাজ উন্নয়ন কমিটির সভাপতি ও ৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি হিসেবে পরিচিত।

এ ছাড়া মো. আফসার যুবদলের সঙ্গে, মো. আলা উদ্দীন জয় ছাত্রদলের সঙ্গে, অনতোষ দাশ স্বেচ্ছাসেবক দলের সঙ্গে এবং মো. মিজানুর রহমান যুবদলের সঙ্গে যুক্ত বলে স্থানীয়ভাবে পরিচিতি রয়েছে। জসিম খাঁ ও মো. করিমের বিরুদ্ধেও রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে জমি দখলের অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয়দের দাবি, দলীয় পরিচয় ও প্রভাব ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে একটি চক্র বিভিন্ন সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি দখলের চেষ্টা করছে। তবে রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেই কেউ অপরাধে জড়িত,এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই; অভিযোগগুলোর আইনগত তদন্ত প্রয়োজন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, সওজের জমিতে থাকা শিশু, বেল ও কাঁঠালগাছ কেটে চারপাশে টিনের বেড়া দেওয়া হয়েছে। ভেতরে কর্মচারীদের আবাসন বা ব্যারাকঘর ভেঙে নতুনভাবে নির্মাণকাজ চলছে। বাইরে মাদ্রাসার কাজ চলছে উল্লেখ করে একটি সাইনবোর্ড টাঙানো রয়েছে।সওজের দাবি, সরকারি জমি অবৈধভাবে দখল করে দোকান নির্মাণ করা হচ্ছে এবং এসব দোকান সালামির বিনিময়ে ভাড়া দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা সংগ্রহের অভিযোগও রয়েছে।

এ বিষয়ে ভেদভেদী পশ্চিম মুসলিম পাড়া সমাজ উন্নয়ন কমিটির সাধারণ সম্পাদক আলা উদ্দীন জয় অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “জায়গাটি সড়ক বিভাগের সরকারি জমি নয়। মাদ্রাসার নামে সব কাগজপত্র রয়েছে। আমিই মাদ্রাসার সাইনবোর্ড লাগিয়েছি।তিনি দাবি করেন, ওই জায়গায় অস্ট্রেলিয়ার একটি কোম্পানি কর্মীদের আবাসনের জন্য ভবন নির্মাণ করেছিল। সড়ক বিভাগ সেখানে কোনো আবাসন নির্মাণ করেনি। তবে ওই এলাকায় সড়ক বিভাগের ১ দশমিক ৭৫ একর জমি রয়েছে বলেও জানান তিনি।

রাঙামাটি সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ চাকমা বলেন, ভেদভেদী এলাকায় মসজিদ ও মাদ্রাসার নামে সরকারি জমি দখলের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এ ঘটনায় ভূমিদস্যুরা সওজের কর্মচারীদের প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছে। প্রতিকার চেয়ে কোতোয়ালি থানায় জিডি করা হয়েছে। জিডি তদন্তের জন্য আদালতের অনুমতি পাওয়া গেছে।

তিনি জানান, বিষয়টি রাঙামাটি সদর জোন কমান্ডার, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)সহ প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে জানানো হয়েছে। জেলা বিএনপির সভাপতি ও রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দীপন তালুকদার দীপু এবং জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফুল ইসলাম শাকিলকেও তিনি অবৈধ স্থাপনার ছবি পাঠিয়ে বিষয়টি অবহিত করেছেন বলে দাবি করেন।

রাঙামাটি কোতোয়ালি থানার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই (নিরস্ত্র) আমজাদূর রহমান বলেন, সড়ক বিভাগের সরকারি জমি দখলের অভিযোগে জিডি হয়েছে। বিষয়টি তদন্তের জন্য আদালত অনুমতি দিয়েছেন। আমরা তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছি।

সরকারি জমি দখল, কর্মচারীদের আবাসন ভাঙচুর এবং মাদ্রাসা ও এবাদতখানার নামে জমি ব্যবহারের অভিযোগ ঘিরে ভেদভেদী এলাকায় এখন নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সরকারি জমির প্রকৃত সীমানা নির্ধারণ, মালিকানা যাচাই, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের সত্যতা এবং অভিযোগে উল্লিখিত ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছেন এলাকাবাসী।