ঢাকা ০৮:৪৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নড়াইলে জাতীয় নারী নৌকাবাইচ ও সাংস্কৃতিক উৎসবের উদ্বোধন

রিপন বিশ্বাস, নড়াইল
  • আপডেট সময় : ০৬:৩৮:৫৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬
  • / ২০ বার পঠিত

লোকজ সংস্কৃতির আবহ, নারীর ক্ষমতায়ন এবং গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার মেলবন্ধনে নড়াইলে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী ‘জাতীয় নারী নৌকাবাইচ, সাংস্কৃতিক উৎসব ও ফ্রি হেলথ ক্যাম্প-২০২৬’।

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টায় নড়াইল সদর উপজেলার শেখহাটি ইউনিয়নের এগারোখান অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী গুয়াখোলা মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠ প্রাঙ্গণে এ মহতী উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। নড়াইল-১ আসনের সংসদ সদস্য বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এ বর্ণিল উৎসবের উদ্বোধন ঘোষণা করেন।

আয়োজনের মূল আকর্ষণ হিসেবে চিত্রা ও নবগঙ্গার জনপদে ১৬টি মতুয়া নারী দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হচ্ছে রোমাঞ্চকর নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা। একই সঙ্গে উৎসব প্রাঙ্গণে আয়োজিত ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প থেকে প্রথম দিনেই প্রত্যন্ত অঞ্চলের পাঁচ শতাধিক মানুষ বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ গ্রহণ করেছেন।

নড়াইলের সমৃদ্ধ ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পর্যটন সম্ভাবনাকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের উদ্যোগে এ ব্যতিক্রমী উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। এটি যৌথভাবে বাস্তবায়ন করছে অলকাপুরী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও স্পেলবাউন্ড কমিউনিকেশনস লিমিটেড।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম বলেন, নড়াইলের মাটি শিল্প-সাহিত্য ও লোকজ ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ। বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান, চারণকবি ও জারি সম্রাট মোসলেম উদ্দীন এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নৃত্যশিল্পী উদয় শংকর ও সেতারবাদক পণ্ডিত রবিশংকরের স্মৃতিবিজড়িত এ জনপদ বরাবরই দেশের সংস্কৃতিকে নেতৃত্ব দিয়েছে। নড়াইলের এ ঐতিহাসিক গৌরব ও পর্যটন সম্পদকে সঠিকভাবে ব্র্যান্ডিং করে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের সামনে উপস্থাপন করার এখনই মোক্ষম সময়।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. সামীমুজ্জামান বলেন, নড়াইলের প্রকৃতি, নদী ও সাংস্কৃতিক সম্পদকে সুপরিকল্পিতভাবে কাজে লাগিয়ে একটি আধুনিক পর্যটন হাব গড়ে তোলার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে বিশ্বখ্যাত চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের চিত্রকর্ম ও তাঁর স্মৃতিবিজড়িত বাড়িকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মানের একটি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তুলতে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করবে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, মতুয়া সম্প্রদায়ের নারীদের বৈঠা হাতে জলতরঙ্গে এমন প্রাণবন্ত উপস্থিতি গ্রামীণ নারীর অন্তর্নিহিত শক্তি, সাহস ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে দারুণ বার্তা দিচ্ছে।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (উপসচিব) লিংকন বিশ্বাসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের পরিচালক গনী উল আজম, নড়াইলের সিভিল সার্জন ডা. আব্দুর রশিদ এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নূর-ই-আলম সিদ্দিকী।

অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জেলা পরিষদের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মোস্তাফিজুর রহমান আলেক ও নড়াইল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা টি. এম. রাহসিন কবির। অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দিয়ে তৃণমূলের নারীদের এগিয়ে নিতে এমন আয়োজনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন অলকাপুরী সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সভাপতি বনানী বিশ্বাস।

এদিকে উদ্বোধনী পর্বেই জেলার সামগ্রিক পর্যটন বিকাশের স্বার্থে একটি ঐতিহাসিক স্মারকলিপি তুলে ধরা হয়। সাপ্তাহিক নড়াইলকণ্ঠ পত্রিকার সম্পাদক কাজী হাফিজুর রহমান নড়াইলকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘পর্যটন জেলা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানান।

তিনি জেলার ইতিহাস, প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য ও গুণীজনদের স্থিরচিত্রসম্বলিত একটি বিশেষ স্মারক অ্যালবাম এবং দাবিনামা প্রধান অতিথি সংসদ সদস্য বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম ও পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যানের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেন।

উৎসব উপলক্ষে দুই দিনব্যাপী প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে ফ্রি হেলথ ক্যাম্প। এতে সাধারণ চিকিৎসা পরামর্শের পাশাপাশি গর্ভবতী নারী ও প্রবীণদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণ করা হচ্ছে।

আয়োজকরা জানান, প্রথম দিনেই পাঁচ শতাধিক প্রান্তিক মানুষ এ ক্যাম্প থেকে সেবা গ্রহণ করেছেন। উৎসবটির পাওয়ার্ড বাই পার্টনার হিসেবে রয়েছে গ্লোবাল মেডিক্লাউড (বিডি) লিমিটেড এবং স্পন্সর হিসেবে যুক্ত রয়েছে টি. কে. গ্রুপ। সার্বিক সহযোগিতায় রয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল, হাইপারটেনশন অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার রংপুর, ইউনিকো হসপিটালস, এটুআই, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি।

আয়োজকদের প্রত্যাশা, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও মানবিক স্বাস্থ্যসেবার এ মেলবন্ধন নড়াইলের লোকজ ঐতিহ্যকে বিশ্বমঞ্চে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দেবে।

ট্যাগস :

নড়াইলে জাতীয় নারী নৌকাবাইচ ও সাংস্কৃতিক উৎসবের উদ্বোধন

আপডেট সময় : ০৬:৩৮:৫৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬

লোকজ সংস্কৃতির আবহ, নারীর ক্ষমতায়ন এবং গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার মেলবন্ধনে নড়াইলে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী ‘জাতীয় নারী নৌকাবাইচ, সাংস্কৃতিক উৎসব ও ফ্রি হেলথ ক্যাম্প-২০২৬’।

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টায় নড়াইল সদর উপজেলার শেখহাটি ইউনিয়নের এগারোখান অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী গুয়াখোলা মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠ প্রাঙ্গণে এ মহতী উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। নড়াইল-১ আসনের সংসদ সদস্য বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এ বর্ণিল উৎসবের উদ্বোধন ঘোষণা করেন।

আয়োজনের মূল আকর্ষণ হিসেবে চিত্রা ও নবগঙ্গার জনপদে ১৬টি মতুয়া নারী দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হচ্ছে রোমাঞ্চকর নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা। একই সঙ্গে উৎসব প্রাঙ্গণে আয়োজিত ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প থেকে প্রথম দিনেই প্রত্যন্ত অঞ্চলের পাঁচ শতাধিক মানুষ বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ গ্রহণ করেছেন।

নড়াইলের সমৃদ্ধ ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পর্যটন সম্ভাবনাকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের উদ্যোগে এ ব্যতিক্রমী উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। এটি যৌথভাবে বাস্তবায়ন করছে অলকাপুরী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও স্পেলবাউন্ড কমিউনিকেশনস লিমিটেড।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম বলেন, নড়াইলের মাটি শিল্প-সাহিত্য ও লোকজ ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ। বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান, চারণকবি ও জারি সম্রাট মোসলেম উদ্দীন এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নৃত্যশিল্পী উদয় শংকর ও সেতারবাদক পণ্ডিত রবিশংকরের স্মৃতিবিজড়িত এ জনপদ বরাবরই দেশের সংস্কৃতিকে নেতৃত্ব দিয়েছে। নড়াইলের এ ঐতিহাসিক গৌরব ও পর্যটন সম্পদকে সঠিকভাবে ব্র্যান্ডিং করে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের সামনে উপস্থাপন করার এখনই মোক্ষম সময়।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. সামীমুজ্জামান বলেন, নড়াইলের প্রকৃতি, নদী ও সাংস্কৃতিক সম্পদকে সুপরিকল্পিতভাবে কাজে লাগিয়ে একটি আধুনিক পর্যটন হাব গড়ে তোলার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে বিশ্বখ্যাত চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের চিত্রকর্ম ও তাঁর স্মৃতিবিজড়িত বাড়িকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মানের একটি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তুলতে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করবে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, মতুয়া সম্প্রদায়ের নারীদের বৈঠা হাতে জলতরঙ্গে এমন প্রাণবন্ত উপস্থিতি গ্রামীণ নারীর অন্তর্নিহিত শক্তি, সাহস ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে দারুণ বার্তা দিচ্ছে।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (উপসচিব) লিংকন বিশ্বাসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের পরিচালক গনী উল আজম, নড়াইলের সিভিল সার্জন ডা. আব্দুর রশিদ এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নূর-ই-আলম সিদ্দিকী।

অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জেলা পরিষদের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মোস্তাফিজুর রহমান আলেক ও নড়াইল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা টি. এম. রাহসিন কবির। অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দিয়ে তৃণমূলের নারীদের এগিয়ে নিতে এমন আয়োজনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন অলকাপুরী সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সভাপতি বনানী বিশ্বাস।

এদিকে উদ্বোধনী পর্বেই জেলার সামগ্রিক পর্যটন বিকাশের স্বার্থে একটি ঐতিহাসিক স্মারকলিপি তুলে ধরা হয়। সাপ্তাহিক নড়াইলকণ্ঠ পত্রিকার সম্পাদক কাজী হাফিজুর রহমান নড়াইলকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘পর্যটন জেলা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানান।

তিনি জেলার ইতিহাস, প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য ও গুণীজনদের স্থিরচিত্রসম্বলিত একটি বিশেষ স্মারক অ্যালবাম এবং দাবিনামা প্রধান অতিথি সংসদ সদস্য বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম ও পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যানের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেন।

উৎসব উপলক্ষে দুই দিনব্যাপী প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে ফ্রি হেলথ ক্যাম্প। এতে সাধারণ চিকিৎসা পরামর্শের পাশাপাশি গর্ভবতী নারী ও প্রবীণদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণ করা হচ্ছে।

আয়োজকরা জানান, প্রথম দিনেই পাঁচ শতাধিক প্রান্তিক মানুষ এ ক্যাম্প থেকে সেবা গ্রহণ করেছেন। উৎসবটির পাওয়ার্ড বাই পার্টনার হিসেবে রয়েছে গ্লোবাল মেডিক্লাউড (বিডি) লিমিটেড এবং স্পন্সর হিসেবে যুক্ত রয়েছে টি. কে. গ্রুপ। সার্বিক সহযোগিতায় রয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল, হাইপারটেনশন অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার রংপুর, ইউনিকো হসপিটালস, এটুআই, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি।

আয়োজকদের প্রত্যাশা, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও মানবিক স্বাস্থ্যসেবার এ মেলবন্ধন নড়াইলের লোকজ ঐতিহ্যকে বিশ্বমঞ্চে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দেবে।