ঢাকা ০৯:১২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চুয়াডাঙ্গা কারাগারে বদলে গেছে বন্দিজীবনের চিত্র

শিমুল রেজা
  • আপডেট সময় : ০৬:১৯:০৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / ১১ বার পঠিত

কারাগার মানেই শুধু দুঃখ-কষ্ট কিংবা সাজা ভোগের জায়গা—সেই প্রচলিত ধারণা বদলাতে শুরু করেছে চুয়াডাঙ্গা কারাগারে। প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও দক্ষ ব্যবস্থাপনায় কারাগারটি ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে সংশোধনাগার। বন্দিদের সুযোগ-সুবিধা, নিরাপত্তা, মানসিক স্বাস্থ্য, বিনোদন ও পুনর্বাসন—সব ক্ষেত্রেই নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ।

বর্তমানে চুয়াডাঙ্গা কারাগারে হাজতি ও কয়েদিদের পাশাপাশি দর্শনার্থীদেরও আগের মতো দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে না। নিয়মিত বন্দিদের খোঁজখবর নেওয়া, তাদের অভাব-অভিযোগ শোনা এবং তা সমাধানে উদ্যোগ নিচ্ছেন কারাগারের জেলার। পাশাপাশি জেলা প্রশাসক, দায়রা জজসহ সরকারি ও বেসরকারি কারা পরিদর্শকদের নিয়মিত পরিদর্শনের কারণে কারা প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বেড়েছে বলে জানিয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ।

কারা কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, প্রায় ৯ একর জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত চুয়াডাঙ্গা কারাগারে বর্তমানে ৭৯০ জন পুরুষ ও ২৭ জন নারী বন্দি রয়েছেন। কারাগারে রয়েছে একতলা ও দোতলা ভবন, আটটি বন্দি ভবন, ২০ শয্যার একটি কারা হাসপাতাল, একটি কিশোর ওয়ার্ড, একটি লাইব্রেরি, ২৪টি সেল ও একটি ক্যান্টিন। হাসপাতালে সার্বক্ষণিক একজন চিকিৎসক দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া জেলা সুপারের জন্য আবাসিক ভবন এবং পুরুষ ও নারী কারারক্ষীদের জন্য পৃথক ব্যারাক রয়েছে।

বর্তমানে জেলারসহ কারাগারে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন ৯০ জন। এর মধ্যে ৮০ জন পুরুষ ও ১০ জন নারী কারারক্ষী দায়িত্ব পালন করছেন। কারাগারের পরিবর্তিত পরিবেশের বিষয়ে সম্প্রতি তিন বছর কারাভোগ শেষে মুক্তি পাওয়া এক বন্দি সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাঁর ভাষ্য, গত কয়েক মাসে কারাগারের খাবারসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে পরিবর্তন এসেছে। কঠোর নিয়মানুবর্তিতার কারণে বর্তমানে কারাগারের ভেতরে দাগি আসামিরাও কোনো ধরনের অপকর্মের সুযোগ পাচ্ছেন না।

চুয়াডাঙ্গা কারাগারের জেলার মো. শাখাওয়াত হোসেন বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর গত ২০ দিনে কারাগারের অভ্যন্তর সম্পূর্ণ মাদকমুক্ত করা হয়েছে। অবৈধ দ্রব্যের প্রবেশ রোধে নিয়মিত তল্লাশি চালানোর পাশাপাশি সন্দেহভাজন বন্দি ও স্টাফদের বিশেষ নজরদারিতে রাখা হয়েছে।

তিনি বলেন, কারা ক্যাম্পাসকে মোবাইল ফোনমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দর্শনার্থীদের জন্য বিনামূল্যে বন্দিদের সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা হয়েছে। হতদরিদ্র বন্দিদের আইনি সহায়তার প্রয়োজন হলে জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির মাধ্যমে আইনজীবী নিয়োগের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।

বন্দিদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান জেলার। আগে চিত্তবিনোদনের সুযোগ সীমিত থাকলেও বর্তমানে প্রতিটি ওয়ার্ডে টেলিভিশন দেখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রয়েছে ক্যারাম খেলার সুযোগ। শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখতে ব্যায়াম ও শরীরচর্চার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

কারাগারের পরিবেশ সুন্দর রাখতে চারপাশে বিভিন্ন ধরনের ফুলের বাগান করা হয়েছে। বন্দিদের বসে সময় কাটানোর জন্য তৈরি করা হয়েছে পাকা বেঞ্চ। ফলে কারাগারের পরিবেশেও এসেছে দৃশ্যমান পরিবর্তন। কারা কর্তৃপক্ষের মূল লক্ষ্য—বন্দিরা সাজা শেষে যেন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারেন। এ জন্য নিরক্ষরতা দূরীকরণ ও ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি ওয়ার্ডে নিজ নিজ ধর্ম পালনের সুযোগ রাখা হয়েছে।

কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, সংশোধন ও পুনর্বাসনমূলক এসব উদ্যোগের মাধ্যমে বন্দিদের অপরাধপ্রবণতা কমিয়ে তাদের সমাজে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে দেওয়ার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে।

ট্যাগস :

চুয়াডাঙ্গা কারাগারে বদলে গেছে বন্দিজীবনের চিত্র

আপডেট সময় : ০৬:১৯:০৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কারাগার মানেই শুধু দুঃখ-কষ্ট কিংবা সাজা ভোগের জায়গা—সেই প্রচলিত ধারণা বদলাতে শুরু করেছে চুয়াডাঙ্গা কারাগারে। প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও দক্ষ ব্যবস্থাপনায় কারাগারটি ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে সংশোধনাগার। বন্দিদের সুযোগ-সুবিধা, নিরাপত্তা, মানসিক স্বাস্থ্য, বিনোদন ও পুনর্বাসন—সব ক্ষেত্রেই নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ।

বর্তমানে চুয়াডাঙ্গা কারাগারে হাজতি ও কয়েদিদের পাশাপাশি দর্শনার্থীদেরও আগের মতো দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে না। নিয়মিত বন্দিদের খোঁজখবর নেওয়া, তাদের অভাব-অভিযোগ শোনা এবং তা সমাধানে উদ্যোগ নিচ্ছেন কারাগারের জেলার। পাশাপাশি জেলা প্রশাসক, দায়রা জজসহ সরকারি ও বেসরকারি কারা পরিদর্শকদের নিয়মিত পরিদর্শনের কারণে কারা প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বেড়েছে বলে জানিয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ।

কারা কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, প্রায় ৯ একর জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত চুয়াডাঙ্গা কারাগারে বর্তমানে ৭৯০ জন পুরুষ ও ২৭ জন নারী বন্দি রয়েছেন। কারাগারে রয়েছে একতলা ও দোতলা ভবন, আটটি বন্দি ভবন, ২০ শয্যার একটি কারা হাসপাতাল, একটি কিশোর ওয়ার্ড, একটি লাইব্রেরি, ২৪টি সেল ও একটি ক্যান্টিন। হাসপাতালে সার্বক্ষণিক একজন চিকিৎসক দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া জেলা সুপারের জন্য আবাসিক ভবন এবং পুরুষ ও নারী কারারক্ষীদের জন্য পৃথক ব্যারাক রয়েছে।

বর্তমানে জেলারসহ কারাগারে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন ৯০ জন। এর মধ্যে ৮০ জন পুরুষ ও ১০ জন নারী কারারক্ষী দায়িত্ব পালন করছেন। কারাগারের পরিবর্তিত পরিবেশের বিষয়ে সম্প্রতি তিন বছর কারাভোগ শেষে মুক্তি পাওয়া এক বন্দি সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাঁর ভাষ্য, গত কয়েক মাসে কারাগারের খাবারসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে পরিবর্তন এসেছে। কঠোর নিয়মানুবর্তিতার কারণে বর্তমানে কারাগারের ভেতরে দাগি আসামিরাও কোনো ধরনের অপকর্মের সুযোগ পাচ্ছেন না।

চুয়াডাঙ্গা কারাগারের জেলার মো. শাখাওয়াত হোসেন বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর গত ২০ দিনে কারাগারের অভ্যন্তর সম্পূর্ণ মাদকমুক্ত করা হয়েছে। অবৈধ দ্রব্যের প্রবেশ রোধে নিয়মিত তল্লাশি চালানোর পাশাপাশি সন্দেহভাজন বন্দি ও স্টাফদের বিশেষ নজরদারিতে রাখা হয়েছে।

তিনি বলেন, কারা ক্যাম্পাসকে মোবাইল ফোনমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দর্শনার্থীদের জন্য বিনামূল্যে বন্দিদের সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা হয়েছে। হতদরিদ্র বন্দিদের আইনি সহায়তার প্রয়োজন হলে জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির মাধ্যমে আইনজীবী নিয়োগের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।

বন্দিদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান জেলার। আগে চিত্তবিনোদনের সুযোগ সীমিত থাকলেও বর্তমানে প্রতিটি ওয়ার্ডে টেলিভিশন দেখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রয়েছে ক্যারাম খেলার সুযোগ। শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখতে ব্যায়াম ও শরীরচর্চার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

কারাগারের পরিবেশ সুন্দর রাখতে চারপাশে বিভিন্ন ধরনের ফুলের বাগান করা হয়েছে। বন্দিদের বসে সময় কাটানোর জন্য তৈরি করা হয়েছে পাকা বেঞ্চ। ফলে কারাগারের পরিবেশেও এসেছে দৃশ্যমান পরিবর্তন। কারা কর্তৃপক্ষের মূল লক্ষ্য—বন্দিরা সাজা শেষে যেন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারেন। এ জন্য নিরক্ষরতা দূরীকরণ ও ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি ওয়ার্ডে নিজ নিজ ধর্ম পালনের সুযোগ রাখা হয়েছে।

কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, সংশোধন ও পুনর্বাসনমূলক এসব উদ্যোগের মাধ্যমে বন্দিদের অপরাধপ্রবণতা কমিয়ে তাদের সমাজে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে দেওয়ার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে।