ঢাকা ০৬:৫৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬, ১৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ডুমুরিয়ায় রঙিন মাছ ও সমন্বিত খামারে রাহুলের বাজিমাত

শেখ মাহতাব হোসেন
  • আপডেট সময় : ০৬:০৪:১১ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬
  • / ১৯ বার পঠিত

খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বান্দা গ্রামে গড়ে উঠেছে এক অভাবনীয় কৃষি ও মৎস্য বিপ্লব। বাড়ির আঙিনায় ও খামারে হরেক পদের রঙিন মাছের পোনা উৎপাদন, উন্নত জাতের গলদা-বাগদা চাষ, নানা পদের সবজি ফালানো এবং পশুপাখি পালন করে সাফল্যের নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন স্থানীয় তরুণ উদ্যোক্তা রাহুল বিশ্বাস। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘বিশ্বাস এগ্রো প্রজেক্ট ও মৎস্য হ্যাচারি’ ইতোমধ্যে গোটা এলাকায় বেশ সাড়া ফেলেছে।

ডুমুরিয়া সদর থেকে পিচঢালা পথ ধরে প্রায় চার কিলোমিটার এগোলেই চোখে পড়বে ছায়া-সুনিবিড় বান্দা গ্রাম। রাস্তার পাশেই রাহুলের এই সুবিশাল সমন্বিত কৃষি ও মৎস্য প্রজেক্ট। প্রজেক্টে গিয়ে দেখা যায় এক নজরকাড়া দৃশ্য—হ্যাচারির অফিসের সামনে সাইকেল থামিয়ে এক শিক্ষার্থী রাহুলের কাছে বায়না ধরেছে সাদা, কালো, হলুদ ও কমলা রঙের একজোড়া সৌখিন মাছের, যা সে বাড়িতে আসা প্রিয় বন্ধুকে উপহার দেবে। রাহুলের হাসিমুখের আতিথেয়তা আর সুলভ মূল্যে মাছ দেওয়ার চিত্রই বলে দেয় গ্রাহকদের সঙ্গে তাঁর আত্মিক সম্পর্কের কথা।

কৃষি কলেজের শিক্ষার্থী থাকাকালীন সময় থেকেই রাহুল বিশ্বাসের মন টেনেছিল কৃষিকাজ। দীর্ঘদিন ধরে উন্নত জাতের গলদা-বাগদা চিংড়ি চাষ করে সফলতা পাওয়ার পর, অ্যাকুরিয়ামের সৌখিন মাছের বাজারের ব্যাপক চাহিদা দেখে দুই বছর আগে অর্নামেন্টাল ফিশ চাষের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। গত বছর তিনটি হাউস, আধুনিক পানির পাম্প এবং ছয়টি পুকুর সমন্বয়ে গড়ে তোলেন বিশেষায়িত ‘সৌখিন মাছের হ্যাচারি’।

বর্তমানে তাঁর হ্যাচারিতে মলি, মুন্টেল, কমেন্ট, শেখ পোলার, অ্যাঞ্জেল, গাপ্পি, গোল্ডফিশ, কৈ-কার্প, বাটারফ্লাই ও টেট্রাসহ প্রায় ২০টি দুর্লভ ও আকর্ষণীয় প্রজাতির রঙিন মাছের পোনা উৎপাদন হচ্ছে। খুলনার খালিশপুর থেকে শুরু করে ঢাকার কাটাবন পর্যন্ত বড় বড় মৎস্য ব্যবসায়ীরা তাঁর থেকে নিয়মিত মাছ সংগ্রহ করছেন। এ ছাড়া দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে অর্ডার এলে অক্সিজেন প্যাকেজিংয়ের মাধ্যমে সুনিপুণভাবে মাছ পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেন তিনি। জাতভেদে এসব মাছ প্রতি জোড়া বা পিস ২০ টাকা থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়।

রাহুল বিশ্বাস জানান, সৌখিন মাছের এই বাজার বছরের ১২ মাসই সমান সচল থাকে। তবে শুধু রঙিন মাছই নয়, তাঁর পারিবারিক ১৬ বিঘা জমিতে রয়েছে মোট ৯টি সুবিশাল পুকুর। এর মধ্যে আটটিতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে শুধু পুরুষ জাতের (অল-মেল) গলদা এবং একটিতে ‘সিপি’ আধুনিক পদ্ধতিতে বাগদা চিংড়ি চাষ করছেন।

তিনি বলেন, ঘেরের পাড় বা আইলে ফলানো হচ্ছে থোকায় থোকায় শসা, বরবটি ও লাউসহ নানাবিধ বিষমুক্ত সবজি। শুধু তাই নয়, প্রজেক্টে যুক্ত রয়েছে গরুর প্রজনন কেন্দ্র, উন্নত বিদেশি জাতের কুকুর পালন এবং বাড়ির ছাদে বাহারি জাতের কবুতর প্রজনন ও বিপণন কেন্দ্র।

নিজের এই কর্মযজ্ঞ সম্পর্কে তরুণ উদ্যোক্তা রাহুল বলেন, আমার এই খামারে বর্তমানে ছয়জন নিয়মিত শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। তাঁদের সাথে আমি নিজেও সার্বক্ষণিক শ্রম দিই। সব ধরনের আনুষঙ্গিক খরচ বাদ দিয়ে বছরে প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা নিট মুনাফা থাকে।

রাহুলের এই অসাধারণ উদ্যোগে প্রশংসা ভাসছে পুরো এলাকা। ডুমুরিয়ার সফল গলদা-বাগদা চাষি ও কলেজ শিক্ষক নিত্যানন্দ মণ্ডল বলেন, রঙিন মাছের কৃত্রিম প্রজনন ও বাণিজ্যিক বিপণনে রাহুল যে উদ্ভাবনী দৃষ্টিভঙ্গি দেখিয়েছেন, তা এই অঞ্চলের অন্য বেকার যুবকদের জন্য অনুকরণীয়। চিংড়ি ও সবজি চাষেও তিনি দারুণ সাফল্য অর্জন করেছেন।

ডুমুরিয়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জিল্লুর রহমান রিগ্যান রাহুলের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, চিংড়ি প্রধান ডুমুরিয়ায় সৌখিন রঙিন মাছ চাষের ধারণাটি বেশ সম্ভাবনাময়। রাহুল বিশ্বাস যেভাবে পেশাদারিত্ব ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অল-মেল গলদা ও রঙিন মাছের সমন্বিত চাষ করছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। উপজেলা মৎস্য দপ্তরের পক্ষ থেকে আমরা তাঁর মতো উদীয়মান উদ্যোক্তাদের সব ধরনের কারিগরি সহায়তা দিতে প্রস্তুত।

ট্যাগস :

ডুমুরিয়ায় রঙিন মাছ ও সমন্বিত খামারে রাহুলের বাজিমাত

আপডেট সময় : ০৬:০৪:১১ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬

খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বান্দা গ্রামে গড়ে উঠেছে এক অভাবনীয় কৃষি ও মৎস্য বিপ্লব। বাড়ির আঙিনায় ও খামারে হরেক পদের রঙিন মাছের পোনা উৎপাদন, উন্নত জাতের গলদা-বাগদা চাষ, নানা পদের সবজি ফালানো এবং পশুপাখি পালন করে সাফল্যের নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন স্থানীয় তরুণ উদ্যোক্তা রাহুল বিশ্বাস। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘বিশ্বাস এগ্রো প্রজেক্ট ও মৎস্য হ্যাচারি’ ইতোমধ্যে গোটা এলাকায় বেশ সাড়া ফেলেছে।

ডুমুরিয়া সদর থেকে পিচঢালা পথ ধরে প্রায় চার কিলোমিটার এগোলেই চোখে পড়বে ছায়া-সুনিবিড় বান্দা গ্রাম। রাস্তার পাশেই রাহুলের এই সুবিশাল সমন্বিত কৃষি ও মৎস্য প্রজেক্ট। প্রজেক্টে গিয়ে দেখা যায় এক নজরকাড়া দৃশ্য—হ্যাচারির অফিসের সামনে সাইকেল থামিয়ে এক শিক্ষার্থী রাহুলের কাছে বায়না ধরেছে সাদা, কালো, হলুদ ও কমলা রঙের একজোড়া সৌখিন মাছের, যা সে বাড়িতে আসা প্রিয় বন্ধুকে উপহার দেবে। রাহুলের হাসিমুখের আতিথেয়তা আর সুলভ মূল্যে মাছ দেওয়ার চিত্রই বলে দেয় গ্রাহকদের সঙ্গে তাঁর আত্মিক সম্পর্কের কথা।

কৃষি কলেজের শিক্ষার্থী থাকাকালীন সময় থেকেই রাহুল বিশ্বাসের মন টেনেছিল কৃষিকাজ। দীর্ঘদিন ধরে উন্নত জাতের গলদা-বাগদা চিংড়ি চাষ করে সফলতা পাওয়ার পর, অ্যাকুরিয়ামের সৌখিন মাছের বাজারের ব্যাপক চাহিদা দেখে দুই বছর আগে অর্নামেন্টাল ফিশ চাষের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। গত বছর তিনটি হাউস, আধুনিক পানির পাম্প এবং ছয়টি পুকুর সমন্বয়ে গড়ে তোলেন বিশেষায়িত ‘সৌখিন মাছের হ্যাচারি’।

বর্তমানে তাঁর হ্যাচারিতে মলি, মুন্টেল, কমেন্ট, শেখ পোলার, অ্যাঞ্জেল, গাপ্পি, গোল্ডফিশ, কৈ-কার্প, বাটারফ্লাই ও টেট্রাসহ প্রায় ২০টি দুর্লভ ও আকর্ষণীয় প্রজাতির রঙিন মাছের পোনা উৎপাদন হচ্ছে। খুলনার খালিশপুর থেকে শুরু করে ঢাকার কাটাবন পর্যন্ত বড় বড় মৎস্য ব্যবসায়ীরা তাঁর থেকে নিয়মিত মাছ সংগ্রহ করছেন। এ ছাড়া দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে অর্ডার এলে অক্সিজেন প্যাকেজিংয়ের মাধ্যমে সুনিপুণভাবে মাছ পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেন তিনি। জাতভেদে এসব মাছ প্রতি জোড়া বা পিস ২০ টাকা থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়।

রাহুল বিশ্বাস জানান, সৌখিন মাছের এই বাজার বছরের ১২ মাসই সমান সচল থাকে। তবে শুধু রঙিন মাছই নয়, তাঁর পারিবারিক ১৬ বিঘা জমিতে রয়েছে মোট ৯টি সুবিশাল পুকুর। এর মধ্যে আটটিতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে শুধু পুরুষ জাতের (অল-মেল) গলদা এবং একটিতে ‘সিপি’ আধুনিক পদ্ধতিতে বাগদা চিংড়ি চাষ করছেন।

তিনি বলেন, ঘেরের পাড় বা আইলে ফলানো হচ্ছে থোকায় থোকায় শসা, বরবটি ও লাউসহ নানাবিধ বিষমুক্ত সবজি। শুধু তাই নয়, প্রজেক্টে যুক্ত রয়েছে গরুর প্রজনন কেন্দ্র, উন্নত বিদেশি জাতের কুকুর পালন এবং বাড়ির ছাদে বাহারি জাতের কবুতর প্রজনন ও বিপণন কেন্দ্র।

নিজের এই কর্মযজ্ঞ সম্পর্কে তরুণ উদ্যোক্তা রাহুল বলেন, আমার এই খামারে বর্তমানে ছয়জন নিয়মিত শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। তাঁদের সাথে আমি নিজেও সার্বক্ষণিক শ্রম দিই। সব ধরনের আনুষঙ্গিক খরচ বাদ দিয়ে বছরে প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা নিট মুনাফা থাকে।

রাহুলের এই অসাধারণ উদ্যোগে প্রশংসা ভাসছে পুরো এলাকা। ডুমুরিয়ার সফল গলদা-বাগদা চাষি ও কলেজ শিক্ষক নিত্যানন্দ মণ্ডল বলেন, রঙিন মাছের কৃত্রিম প্রজনন ও বাণিজ্যিক বিপণনে রাহুল যে উদ্ভাবনী দৃষ্টিভঙ্গি দেখিয়েছেন, তা এই অঞ্চলের অন্য বেকার যুবকদের জন্য অনুকরণীয়। চিংড়ি ও সবজি চাষেও তিনি দারুণ সাফল্য অর্জন করেছেন।

ডুমুরিয়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জিল্লুর রহমান রিগ্যান রাহুলের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, চিংড়ি প্রধান ডুমুরিয়ায় সৌখিন রঙিন মাছ চাষের ধারণাটি বেশ সম্ভাবনাময়। রাহুল বিশ্বাস যেভাবে পেশাদারিত্ব ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অল-মেল গলদা ও রঙিন মাছের সমন্বিত চাষ করছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। উপজেলা মৎস্য দপ্তরের পক্ষ থেকে আমরা তাঁর মতো উদীয়মান উদ্যোক্তাদের সব ধরনের কারিগরি সহায়তা দিতে প্রস্তুত।