রসিদ ছাড়াই টাকা আদায়ের অভিযোগ
ঝিকরগাছার মাছবাজারে ‘সিন্ডিকেট’ এর দাপট
- আপডেট সময় : ১২:২২:৪৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬
- / ২০ বার পঠিত

যশোরের ঝিকরগাছা পৌর মাছবাজারে ব্যবসা করতে হলে নানা খাতে টাকা দিতে হয়—এমন অভিযোগ করেছেন বাজারের ব্যবসায়ীরা। সমিতির নামে মাছের চালানপ্রতি টাকা আদায়, বরফ বিক্রিতে নিয়ন্ত্রণ, সড়ক দখল করে দোকান বসানো এবং বেলা ১২টার পর মাছ বিক্রিতে অলিখিত নিষেধাজ্ঞার অভিযোগও রয়েছে। এসব অর্থ আদায়ের ক্ষেত্রে অনেক সময় কোনো রসিদ দেওয়া হয় না বলে দাবি ব্যবসায়ীদের।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বাজারে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও সেই নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি বদলায়নি। হাতেগোনা কয়েকজন নিজেদের স্বার্থে বাজার পরিচালনা করায় সাধারণ ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে ব্যবসা করতে পারছেন না।
তবে অভিযোগের কিছু অংশ স্বীকার করলেও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বাজারের সমিতির নেতারা।
বরফ বিক্রিতেও ‘নিয়ন্ত্রণ’
মাছ সংরক্ষণ ও পরিবহনের জন্য বরফ বাজারের ব্যবসায়ীদের অপরিহার্য উপকরণ। কিন্তু এই বরফ বিক্রিকেই ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে।
ব্যবসায়ীদের দেওয়া বরফ বিক্রির খাতার হিসাব অনুযায়ী, কপোতাক্ষ বরফ কল ও সাইমুন আইস ফ্যাক্টরি, দোদেড়িয়া, ঝাঁপা ও রাজগঞ্জ থেকে মুজিবরের নামে ২০২৩ সালে ১১ হাজার ৪০২ পিস, ২০২৪ সালে ১২ হাজার ৬৩৯ পিস, ২০২৫ সালে ১২ হাজার ৬৮৭ পিস এবং ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ৬ হাজার ১৭২ পিস বরফ বিক্রি হয়েছে।
এই হিসাবে চার বছরে মোট বরফ বিক্রি হয়েছে ৪২ হাজার ৯০০ পিস। প্রতি পিস বরফ থেকে সমিতির নামে ২৮ টাকা করে আদায় করা হলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১২ লাখ ১ হাজার ২০০ টাকা।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, আগে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য কারও কাছ থেকে বরফ কেনার সুযোগ ছিল না। ফলে বাজারের ব্যবসায়ীদের নির্ধারিত বা তুলনামূলক বেশি দামে বরফ কিনতে হতো।
ঝিকরগাছা বাজার ক্ষুদ্র মৎস্য ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি মো. নাদিম সর্দার বলেন, ‘আগে মুজিবর নামে একজনের নির্দিষ্ট একটি ঘর থেকেই বরফ বিক্রি করা হতো। অন্য কেউ বিক্রি করতে পারতেন না। তবে কিছুদিন হলো বিষয়টি উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে।’
চালানপ্রতি টাকা, নেই রসিদ
বরফের পাশাপাশি মাছের চালান থেকেও সমিতির নামে টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, প্রতিটি চালানের বিপরীতে তিন থেকে চার টাকা করে নেওয়া হয়। কিন্তু এর বিপরীতে কোনো রসিদ দেওয়া হয় না।
সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সিরাজুল ইসলামও চালান ও বরফ থেকে টাকা আদায়ের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তবে তিনি দাবি করেন, এসব অর্থ সমিতির হিসাবের আওতাভুক্ত।
সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘সমিতির অন্যান্য সদস্যরা যেভাবে চলতে বলেন, আমি সেভাবেই চলি।’
তবে সমিতির মাসিক বা বার্ষিক মোট আয় কত, সে বিষয়ে তিনি সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ বিল, বাইরের পাইকার এবং বাজারের বিভিন্ন অবৈধ দখলদারের কাছ থেকেও অর্থ আদায় করা হয়। তবে অন্য কোনো খাত থেকে টাকা আদায়ের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সিরাজুল ইসলাম।
১২টার পর মাছ বিক্রিতে অলিখিত নিষেধাজ্ঞা?
বাজারের ব্যবসায়ীদের অভিযোগের আরেকটি বড় অংশ বেলা ১২টার পর মাছ বিক্রিকে ঘিরে। তাঁদের দাবি, প্রতিদিন দুপুর ১২টার পর আড়তে মাছ বিক্রির ওপর অলিখিত নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকে।
এর ফলে দূর-দূরান্ত থেকে মাছ নিয়ে আসা পাইকাররা নির্ধারিত সময়ের পর মাছ বিক্রি করতে না পেরে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। একই সঙ্গে বাজারে স্বাভাবিক বেচাকেনা ও প্রতিযোগিতার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের।
মাছবাজার হাটের মালিক শাহীন আলম বিপ্লব বলেন, ‘হাট ডেকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি আমি নিজেই। কারণ বাইরের পাইকাররা ১২টার পর বাজারে মাছ বেচাকেনা করতে না পারলে খাজনা আদায় হচ্ছে না। এই সিস্টেমের পরিবর্তন চাই।’
তবে বেলা ১২টার পর মাছ বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে কোনো তথ্য তাঁর জানা নেই বলে জানিয়েছেন ঝিকরগাছা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা নান্নু রেজা।
তিনি বলেন, ‘বেলা ১২টার পর মাছ বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে—এমন কোনো বিষয় আমার জানা নেই।’
সড়ক দখল করে দোকান
মাছবাজারের ভেতর ও আশপাশের সড়ক দখল করেও ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, নির্ধারিত চাঁদনির বাইরে পৌরসভার সড়কের ওপর দোকান বসানো হয়েছে। এতে বাজার এলাকায় যানজট তৈরি হচ্ছে। পথচারী ও যানবাহন চলাচলেও দুর্ভোগ বাড়ছে।
বর্তমানে বাজারে সাতটি আড়ত এবং প্রায় ১২০টি খুচরা দোকান রয়েছে। সমিতির সদস্য ১৯৪ জন।
ব্যবসায়ীদের দাবি, বাজারের পরিধি ও ব্যবসা সম্প্রসারণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অবকাঠামোগত উন্নয়ন না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
‘সিন্ডিকেট ভাঙার প্রক্রিয়া চলছে’
সমিতির সদস্য সুমন ইসলাম অভিযোগ করেন, ‘আওয়ামী লীগের লোকজন সিন্ডিকেট করে বাজারটি ধ্বংস করে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে একইভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।’
তবে বর্তমান ব্যবসায়ীদের একাংশের অভিযোগ, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও বাজারে সিন্ডিকেটের প্রভাব পুরোপুরি শেষ হয়নি। তাঁদের দাবি, হাতেগোনা তিন-চারজন এখনো নিজেদের স্বার্থে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন।
ঝিকরগাছা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমরান হাসান সামাদ নিপুণ বলেন, মাছবাজারের সিন্ডিকেট দ্রুত ভেঙে ফেলার প্রক্রিয়া চলছে। একই সঙ্গে বাজার সম্প্রসারণও জরুরি। বাজারে গাড়ি ঢোকার জন্য প্রশস্ত রাস্তা দরকার।
কমিটির মেয়াদ শেষ, নির্বাচনের প্রস্তুতি
এদিকে সমিতির বর্তমান কমিটির বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ঝিকরগাছা উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা মো. নূরোল ইসলাম বলেন, সমিতির বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। আগামী দুই থেকে চার দিনের মধ্যে নতুন কমিটির নির্বাচনের তারিখ প্রকাশ করা হবে।
অন্যদিকে সমিতির সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম জানান, বর্তমান কমিটির অধীনেই সমিতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
বাজারের ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, নতুন কমিটি গঠনের পাশাপাশি বাজারের আয়-ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করা হবে। অর্থ আদায়ের ক্ষেত্রে রসিদ বাধ্যতামূলক করা, বরফ বিক্রিতে প্রতিযোগিতার সুযোগ সৃষ্টি, সড়ক দখলমুক্ত করা এবং মাছ কেনাবেচায় কোনো অলিখিত বিধিনিষেধ থাকলে তা বাতিল করা হবে।
তাঁদের মতে, শুধু কমিটি পরিবর্তন নয়, বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নিয়মতান্ত্রিকতা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
























