আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা
ভিডিও বার্তায় শিক্ষকের নাম বলে শার্শায় প্রবাসীর স্ত্রীর আত্মহত্যা
- আপডেট সময় : ০৭:৪০:২১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
- / ৬৭ বার পঠিত

যশোরের শার্শায় চম্পা খাতুন (৩০) নামে এক প্রবাসীর স্ত্রীর রহস্যজনক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। মৃত্যুর আগে নিজের মোবাইল ফোনে ধারণ করা একটি ভিডিওতে স্থানীয় শিক্ষক কবির হোসেনকে মৃত্যুর জন্য দায়ী করেছেন বলে দাবি করেছেন নিহতের স্বজনরা। এ ঘটনায় ওই শিক্ষকসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা হয়েছে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) বেলা ১১টার দিকে উপজেলার কায়বা ইউনিয়নের ধান্যতাড়া গ্রামে স্বামীর বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। নিহত চম্পা ওই গ্রামের প্রবাসী মিন্টু গাজীর স্ত্রী এবং পার্শ্ববর্তী ভবানীপুর গ্রামের মৃত আহাদ আলীর মেয়ে। পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১৬ বছর আগে মিন্টু গাজীর সঙ্গে চম্পার বিয়ে হয়। তাঁদের সংসারে ১২ বছর বয়সী এক প্রতিবন্ধী মেয়ে ও ছয় বছরের একটি ছেলে রয়েছে। জীবিকার তাগিদে প্রায় পাঁচ বছর আগে মিন্টু গাজী প্রবাসে যান।
স্বজনদের অভিযোগ, স্বামী প্রবাসে থাকার সময় ভবানীপুর গ্রামের মৃত নাজিমুদ্দিন (সোলেমান)-এর ছেলে স্থানীয় শিক্ষক কবির হোসেনের সঙ্গে চম্পার পরিচয় হয়। একপর্যায়ে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে তাঁদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরিবারের দাবি, প্রায় চার বছর ধরে এ সম্পর্ক চলছিল।
এ সময় বিয়ের আশ্বাস দিয়ে চম্পা ও তাঁর স্বামীর পাঠানো বিভিন্ন অঙ্কের অর্থ নেওয়ার অভিযোগও তুলেছেন স্বজনরা। তাঁদের দাবি, সম্প্রতি কবির হোসেন চম্পাকে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানান এবং তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। এতে চম্পা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন বলে দাবি পরিবারের।
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন সকালে চম্পা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে ফোনে বিষয়টি তাঁর ভাইকে জানান। খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা তাঁকে উদ্ধার করে প্রথমে বাগআঁচড়ার একটি স্থানীয় হাসপাতালে এবং পরে নাভারণ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। অবস্থার অবনতি হলে সেখান থেকে তাঁকে যশোর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়। তবে হাসপাতালে পৌঁছানোর পর কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
এদিকে, মৃত্যুর আগে চম্পা নিজের মোবাইল ফোনে একটি ভিডিও বার্তা ধারণ করেছিলেন বলে দাবি করেছেন তাঁর স্বজনরা। তাঁদের দাবি, ওই ভিডিওতে তিনি শিক্ষক কবির হোসেনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে নিজের মৃত্যুর জন্য তাঁকে দায়ী করেন। ভিডিওতে তাঁকে বলতে শোনা যায় বলে স্বজনরা জানিয়েছেন, সে আমার সব শেষ করেছে। আমার মৃত্যুর জন্য একমাত্র কবির দায়ী, আর কেউ নয়।
এ ঘটনায় নিহত চম্পা বেগমের চাচা শ্বশুর শরফত আলী বলেন, আমাদের ছেলে মিন্টু রহমান দীর্ঘদিন ধরে মালয়েশিয়া প্রবাসী। ভবানীপুর গ্রামে আমার ছেলের শ্বশুরবাড়ির পাশে স্কুল শিক্ষক কবিরুলের সাথে আমাদের পুত্রবধু চম্পা বেগমের দীর্ঘদিনের পরকীয়া সম্পর্ক ছিল। বিয়ের প্রলোভনে গোপনে আমাদের পুত্রবধুর সাথে কবিরুল অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন এবং আমাদের ছেলের পাঠানো সকল টাকা-পয়সা কবিরুল আত্মসাত করেছে বলে জানতে পেরেছি। টাকা-পয়সা আত্মসাত করে আমাদের পুত্রবধুকে বিয়ে না করায় তিনি অভিমানে আত্মহত্যা করেছে বলে জেনেছি। আমরা এর সঠিক বিচার চাই।
নিহতের চাচা শ্বশুর আরিফ বিল্লাহ বলেন, কবিরুলের সাথে পরকীয়া সম্পর্কের জেরে আমাদের বৌমা দুটো বাচ্চা রেখে আত্মহত্যা করেছে। আমরা কবিরুলের দৃষ্টান্তমূলক সাজা চাই।
নিহতের ফুপা আমিরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, ঘটনার দিন রাত ১০টার দিকে তাঁরা মামলা করতে থানায় যান। দীর্ঘ সময় অবস্থান করেও তাৎক্ষণিকভাবে মামলা করতে না পেরে তাঁরা ফিরে আসেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষে পরদিন দুপুর ১টার দিকে নিহতের ভাই তরিকুল ইসলাম বাদী হয়ে শার্শা থানায় মামলা করেন। মামলায় শিক্ষক কবির হোসেনসহ দুজনকে আসামি করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও তিন থেকে চারজনকে আসামি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বজনরা। মামলাটি আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে দায়ের করা হয়েছে।
এবিষয়ে কায়বা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম মুঠোফোনে এ প্রতিবেদককে জানান, স্কুল শিক্ষক কবিরুলের সাথে পরকীয়া সম্পর্কের জেরে চম্পা বেগম আত্মহত্যা করেছে বলে আমি শুনেছি। আমাদের ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও কিছু কুচক্রীমহল থানার ওসির সহায়তায় মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছিল। আমি বাধা হওয়ায় সেটি সম্ভব হয়নি। আজ (রবিবার) দুপুরে আমি নিজে উপস্থিত থেকে থানায় মামলা দায়ের করে এসেছি। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তপূর্বক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।
এ ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষক কবিরুল ইসলামের বক্তব্য জানতে তার বাড়িতে গেলে তাকে বাড়িতে না পাওয়ায় তার বক্তব্য গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে শার্শা থানার অফিসার ইনচার্জ শামিনুল হকের নিকট মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি জানান, চম্পা বেগমের আত্মহত্যার ঘটনায় থানায় একটি মামলা হয়েছে। আমরা আসামীকে আটকের চেষ্টা করছি।
মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। গতকাল রাতে চম্পা বেগমের পক্ষে কে বাদী হবে সেটা নিয়ে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা হয়ে বিধায় মামলা গ্রহণ করতে দেরি হয়েছে। এখানে কোন চাপ প্রয়োগ বা অর্থের বিনিময়ে ঘটনা ধামাচাপা চেষ্টার কোন ঘটনা ঘটেনি।
ঘটনাটি ঘিরে এলাকায় শোক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। নিহতের পরিবারের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন স্বজনরা।
























