ঢাকা ১০:০৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo ফেসবুকে মিথ্যা তথ্য প্রচারের অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন Logo শ্যামনগরে যুবলীগ নেতা শুভর বিরুদ্ধে নাশকতা পরিকল্পনার অভিযোগ Logo শ্যামনগরে ছাত্রীশূন্য বিদ্যালয়ে বেতন-ভাতা ও উপবৃত্তি নিয়ে প্রশ্ন Logo নড়াইলে শত শত শিক্ষার্থীর দুর্নীতিবিরোধী শপথ Logo ছেলেকে জবাই করে হত্যার ৫১ দিনের মাথায় বাবাকে গুলি করে হত্যা Logo পুলিশ কর্মকর্তাকে ফাঁসাতে আ’লীগ কর্মীকে বিএনপি বানানোর অভিযোগ Logo প্রেসক্লাব যশোরের সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে জেলা যুবদল সভাপতির সৌজন্য সাক্ষাৎ Logo সাতক্ষীরার আলিপুরে নবগঠিত যুবদল-ছাত্রদল নেতাদের সংবর্ধনা Logo নজরুল বর্ষ উপলক্ষে কেসিসির সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ Logo মণিরামপুরে বর্ণাঢ্য আয়োজনে বিশ্ব শিক্ষক দিবস উদযাপন
চৌগাছায় রবিউলকে ঘিরে রাজনৈতিক পরিচয় বদলের দাবি, টাকার বিনিময়ে দলবদলের অভিযোগ বিএনপির একাংশের

পুলিশ কর্মকর্তাকে ফাঁসাতে আ’লীগ কর্মীকে বিএনপি বানানোর অভিযোগ

বেলাল হোসেন বনি
  • আপডেট সময় : ০৮:৫৬:৩৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬
  • / ৪৩ বার পঠিত

যশোরের চৌগাছা উপজেলায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার রবিউল ইসলামকে ঘিরে তার রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। স্থানীয় আওয়ামী লীগের পুরোনো নথি, মামলার কাগজপত্র এবং বিএনপির নেতাকর্মীদের বক্তব্যে তার রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

এক পক্ষের দাবি, রবিউল আওয়ামী লীগের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। অন্যদিকে গ্রেপ্তারের পর স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতা তাকে বিএনপির কর্মী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়ে পুলিশ হেফাজত থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

রবিউল ইসলাম চৌগাছা উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের মৃত কেরামত আলীর ছেলে। গত ১ অক্টোবর রাত সোয়া ১১টার দিকে তাকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে চলমান অভিযানের অংশ হিসেবে গ্রেপ্তার করে চৌগাছা থানা পুলিশ। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, রবিউলের রাজনৈতিক পরিচয় ও সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে পাওয়া বিভিন্ন তথ্য যাচাই-বাছাই করেই তাকে আইনি প্রক্রিয়ায় আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।

রবিউলের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বিতর্কের মধ্যে ২০১৩ সালের ১৫ নভেম্বরের একটি নথি সামনে এসেছে। এতে চৌগাছা উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক এস এম হাবিবুর রহমানের স্বাক্ষর রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, ওই নথিতে রবিউল ইসলামকে ১০ নম্বর নারায়ণপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

পুলিশের দাবি, পুরোনো রাজনৈতিক পরিচয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন তথ্য এবং বিশেষ সংস্থার কাছ থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই করেই চলমান অভিযানের অংশ হিসেবে রবিউলকে গ্রেপ্তার করা হয়।

তবে গ্রেপ্তারের পরদিন স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতা রবিউলকে বিএনপির কর্মী হিসেবে দাবি করে তাকে পুলিশ হেফাজত থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, রবিউলের আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার নথি থাকায় তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয়।

রবিউলকে আদালতে পাঠানোর পর চৌগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মামুনুর রশিদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ সামনে আসে। এর মধ্যে রবিউলের ছেলে আলামিন খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলে জানা গেছে। অভিযোগে তিনি ওসি মামুনুর রশিদসহ অভিযানিক দলের সদস্যদের বিরুদ্ধে ৫ লাখ টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ করেন।

এদিকে স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতার দাবি, রবিউলকে বিএনপির কর্মী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে পুলিশ হেফাজত থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পরই ওসি মামুনুর রশিদের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ তোলা হচ্ছে। তাদের দাবি, রবিউলের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করে পুলিশ কর্মকর্তাকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

রবিউলের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে ২০১৮ সালের একটি মামলার তথ্যও সামনে এসেছে। ওই বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি যশোর আদালতে দায়ের করা জমিজমা-সংক্রান্ত একটি মামলার নথিতে রবিউল ইসলাম নিজেকে আওয়ামী লীগের সক্রিয় সদস্য হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। মামলার নথিতে তিনি প্রতিপক্ষকে জামায়াত-বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলেও উল্লেখ করেছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।

এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চৌগাছার গুয়াতলী গ্রামের বাজে খানপুর এলাকায় মোস্তফার পোল্ট্রি ফার্মের কাছে বোমা হামলার সঙ্গে রবিউল জড়িত ছিলেন বলেও স্থানীয় কয়েকজন অভিযোগ করেছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে রবিউলের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

রবিউলের বিএনপির রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতাকর্মীর অভিযোগ, নারায়ণপুর ইউনিয়ন বিএনপির একজন শীর্ষ নেতার স্বাক্ষর করা দলীয় প্যাডে রবিউলকে বিএনপির সদস্য হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

নারায়ণপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি তরিকুল ইসলাম ডাবলু বলেন, বিগত ১৩ সালে রবিউল আওয়ামী লীগের কমিটিতে ছিল। সেই কমিটি ১৮ সালে বিলুপ্ত হয়। এরপর সে বিএনপির সঙ্গেই আছে।

তবে ইউনিয়ন বিএনপির একটি অংশের নেতাকর্মীরা তার এ বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন। তাদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রবিউল প্রকাশ্যেই আওয়ামী লীগের পরিচয় ব্যবহার করতেন। বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের হয়রানি, পুলিশ দিয়ে চাপ সৃষ্টি এবং বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত থাকার অভিযোগও তারা করেছেন।

নারায়ণপুর ইউনিয়ন যুবদলের সদস্য আজিজুল ইসলাম, ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য সেলিম রেজা, চৌগাছা উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম এবং যশোর জেলা শ্রমিক দলের সহসভাপতি মহিদুল ইসলামসহ স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতা রবিউলের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

তাদের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিএনপির নাম ব্যবহারকারী একটি সুবিধাবাদী চক্রের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী রাতারাতি বিএনপির পরিচয় নেওয়ার চেষ্টা করছেন। অর্থ ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার বিনিময়ে রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তনের ঘটনাও ঘটছে বলে দাবি করেন তারা।

তাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ব্যক্তিরা হঠাৎ বিএনপির পরিচয়ে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করলে দলের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এতে দলীয় শৃঙ্খলা ও সাংগঠনিক কাঠামোও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মীর অভিযোগ, নারায়ণপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের সঙ্গে দীর্ঘদিন সম্পৃক্ত থাকা ব্যক্তিদের একটি অংশ বর্তমানে বিএনপির পরিচয় নেওয়ার চেষ্টা করছে। স্থানীয় বিএনপির কিছু নেতা অর্থের বিনিময়ে এসব ব্যক্তিকে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ তাদের।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, রবিউলের মতো আরও অনেক ব্যক্তি চৌগাছা উপজেলায় রয়েছেন, যারা আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে এলাকায় পরিচিত। বর্তমানে তারা বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তনের চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

তাদের মতে, বিষয়টি নিয়ে দলীয়ভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ত্যাগী নেতাকর্মী ও সুবিধাবাদীদের আলাদা করা প্রয়োজন। তা না হলে ভবিষ্যতে বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

রবিউলকে ঘিরে ওসি মামুনুর রশিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়েও স্থানীয় বিএনপিতে রয়েছে ভিন্নমত। এক পক্ষের দাবি, রবিউলকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পরই ওসির বিরুদ্ধে ঘুষসহ নানা অভিযোগ তোলা হয়েছে। অন্যদিকে রবিউলের পরিবারের পক্ষ থেকে খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি বরাবর লিখিত অভিযোগে ৫ লাখ টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ করা হয়েছে।

স্থানীয় অপর একটি পক্ষের দাবি, ওসি মামুনুর রশিদ দায়িত্ব নেওয়ার পর মাদক, চোরাচালান ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ায় একটি স্বার্থান্বেষী মহল তার ওপর ক্ষুব্ধ। ওই মহলই পুলিশ কর্মকর্তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভিন্ন তথ্য ছড়াচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।

রবিউল ইসলামের গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে চৌগাছায় এখন মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, তার রাজনৈতিক পরিচয় আসলে কী এবং গ্রেপ্তারের পর তাকে বিএনপির কর্মী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা কেন করা হলো?

স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মতে, রাজনৈতিক পরিচয় যাচাইয়ের ক্ষেত্রে শুধু দলীয় প্যাড বা মৌখিক দাবির ওপর নির্ভর না করে পুরোনো দলীয় নথি, সাংগঠনিক রেকর্ড, মামলা-মোকদ্দমার কাগজপত্র এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

এ বিষয়ে খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি বরাবর পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগকারী আলামিনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

ট্যাগস :

চৌগাছায় রবিউলকে ঘিরে রাজনৈতিক পরিচয় বদলের দাবি, টাকার বিনিময়ে দলবদলের অভিযোগ বিএনপির একাংশের

পুলিশ কর্মকর্তাকে ফাঁসাতে আ’লীগ কর্মীকে বিএনপি বানানোর অভিযোগ

আপডেট সময় : ০৮:৫৬:৩৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬

যশোরের চৌগাছা উপজেলায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার রবিউল ইসলামকে ঘিরে তার রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। স্থানীয় আওয়ামী লীগের পুরোনো নথি, মামলার কাগজপত্র এবং বিএনপির নেতাকর্মীদের বক্তব্যে তার রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

এক পক্ষের দাবি, রবিউল আওয়ামী লীগের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। অন্যদিকে গ্রেপ্তারের পর স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতা তাকে বিএনপির কর্মী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়ে পুলিশ হেফাজত থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

রবিউল ইসলাম চৌগাছা উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের মৃত কেরামত আলীর ছেলে। গত ১ অক্টোবর রাত সোয়া ১১টার দিকে তাকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে চলমান অভিযানের অংশ হিসেবে গ্রেপ্তার করে চৌগাছা থানা পুলিশ। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, রবিউলের রাজনৈতিক পরিচয় ও সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে পাওয়া বিভিন্ন তথ্য যাচাই-বাছাই করেই তাকে আইনি প্রক্রিয়ায় আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।

রবিউলের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বিতর্কের মধ্যে ২০১৩ সালের ১৫ নভেম্বরের একটি নথি সামনে এসেছে। এতে চৌগাছা উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক এস এম হাবিবুর রহমানের স্বাক্ষর রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, ওই নথিতে রবিউল ইসলামকে ১০ নম্বর নারায়ণপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

পুলিশের দাবি, পুরোনো রাজনৈতিক পরিচয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন তথ্য এবং বিশেষ সংস্থার কাছ থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই করেই চলমান অভিযানের অংশ হিসেবে রবিউলকে গ্রেপ্তার করা হয়।

তবে গ্রেপ্তারের পরদিন স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতা রবিউলকে বিএনপির কর্মী হিসেবে দাবি করে তাকে পুলিশ হেফাজত থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, রবিউলের আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার নথি থাকায় তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয়।

রবিউলকে আদালতে পাঠানোর পর চৌগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মামুনুর রশিদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ সামনে আসে। এর মধ্যে রবিউলের ছেলে আলামিন খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলে জানা গেছে। অভিযোগে তিনি ওসি মামুনুর রশিদসহ অভিযানিক দলের সদস্যদের বিরুদ্ধে ৫ লাখ টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ করেন।

এদিকে স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতার দাবি, রবিউলকে বিএনপির কর্মী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে পুলিশ হেফাজত থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পরই ওসি মামুনুর রশিদের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ তোলা হচ্ছে। তাদের দাবি, রবিউলের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করে পুলিশ কর্মকর্তাকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

রবিউলের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে ২০১৮ সালের একটি মামলার তথ্যও সামনে এসেছে। ওই বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি যশোর আদালতে দায়ের করা জমিজমা-সংক্রান্ত একটি মামলার নথিতে রবিউল ইসলাম নিজেকে আওয়ামী লীগের সক্রিয় সদস্য হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। মামলার নথিতে তিনি প্রতিপক্ষকে জামায়াত-বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলেও উল্লেখ করেছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।

এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চৌগাছার গুয়াতলী গ্রামের বাজে খানপুর এলাকায় মোস্তফার পোল্ট্রি ফার্মের কাছে বোমা হামলার সঙ্গে রবিউল জড়িত ছিলেন বলেও স্থানীয় কয়েকজন অভিযোগ করেছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে রবিউলের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

রবিউলের বিএনপির রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতাকর্মীর অভিযোগ, নারায়ণপুর ইউনিয়ন বিএনপির একজন শীর্ষ নেতার স্বাক্ষর করা দলীয় প্যাডে রবিউলকে বিএনপির সদস্য হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

নারায়ণপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি তরিকুল ইসলাম ডাবলু বলেন, বিগত ১৩ সালে রবিউল আওয়ামী লীগের কমিটিতে ছিল। সেই কমিটি ১৮ সালে বিলুপ্ত হয়। এরপর সে বিএনপির সঙ্গেই আছে।

তবে ইউনিয়ন বিএনপির একটি অংশের নেতাকর্মীরা তার এ বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন। তাদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রবিউল প্রকাশ্যেই আওয়ামী লীগের পরিচয় ব্যবহার করতেন। বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের হয়রানি, পুলিশ দিয়ে চাপ সৃষ্টি এবং বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত থাকার অভিযোগও তারা করেছেন।

নারায়ণপুর ইউনিয়ন যুবদলের সদস্য আজিজুল ইসলাম, ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য সেলিম রেজা, চৌগাছা উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম এবং যশোর জেলা শ্রমিক দলের সহসভাপতি মহিদুল ইসলামসহ স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতা রবিউলের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

তাদের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিএনপির নাম ব্যবহারকারী একটি সুবিধাবাদী চক্রের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী রাতারাতি বিএনপির পরিচয় নেওয়ার চেষ্টা করছেন। অর্থ ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার বিনিময়ে রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তনের ঘটনাও ঘটছে বলে দাবি করেন তারা।

তাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ব্যক্তিরা হঠাৎ বিএনপির পরিচয়ে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করলে দলের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এতে দলীয় শৃঙ্খলা ও সাংগঠনিক কাঠামোও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মীর অভিযোগ, নারায়ণপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের সঙ্গে দীর্ঘদিন সম্পৃক্ত থাকা ব্যক্তিদের একটি অংশ বর্তমানে বিএনপির পরিচয় নেওয়ার চেষ্টা করছে। স্থানীয় বিএনপির কিছু নেতা অর্থের বিনিময়ে এসব ব্যক্তিকে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ তাদের।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, রবিউলের মতো আরও অনেক ব্যক্তি চৌগাছা উপজেলায় রয়েছেন, যারা আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে এলাকায় পরিচিত। বর্তমানে তারা বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তনের চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

তাদের মতে, বিষয়টি নিয়ে দলীয়ভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ত্যাগী নেতাকর্মী ও সুবিধাবাদীদের আলাদা করা প্রয়োজন। তা না হলে ভবিষ্যতে বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

রবিউলকে ঘিরে ওসি মামুনুর রশিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়েও স্থানীয় বিএনপিতে রয়েছে ভিন্নমত। এক পক্ষের দাবি, রবিউলকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পরই ওসির বিরুদ্ধে ঘুষসহ নানা অভিযোগ তোলা হয়েছে। অন্যদিকে রবিউলের পরিবারের পক্ষ থেকে খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি বরাবর লিখিত অভিযোগে ৫ লাখ টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ করা হয়েছে।

স্থানীয় অপর একটি পক্ষের দাবি, ওসি মামুনুর রশিদ দায়িত্ব নেওয়ার পর মাদক, চোরাচালান ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ায় একটি স্বার্থান্বেষী মহল তার ওপর ক্ষুব্ধ। ওই মহলই পুলিশ কর্মকর্তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভিন্ন তথ্য ছড়াচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।

রবিউল ইসলামের গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে চৌগাছায় এখন মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, তার রাজনৈতিক পরিচয় আসলে কী এবং গ্রেপ্তারের পর তাকে বিএনপির কর্মী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা কেন করা হলো?

স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মতে, রাজনৈতিক পরিচয় যাচাইয়ের ক্ষেত্রে শুধু দলীয় প্যাড বা মৌখিক দাবির ওপর নির্ভর না করে পুরোনো দলীয় নথি, সাংগঠনিক রেকর্ড, মামলা-মোকদ্দমার কাগজপত্র এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

এ বিষয়ে খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি বরাবর পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগকারী আলামিনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।