ঢাকা ০৬:৪৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা: ইউএনও

মনিরামপুরে ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে প্রতিবন্ধী যুবককে মারধরের অভিযোগ

তৌহিদ হোসেন, মনিরামপুর
  • আপডেট সময় : ০৯:৪১:১৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
  • / ৫৩ বার পঠিত

যশোরের মণিরামপুর উপজেলার কাশিমনগর ইউনিয়নে শারীরিক প্রতিবন্ধী এক যুবককে মারধর ও নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে সংরক্ষিত মহিলা ইউপি সদস্য সালেয়া বেগমের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় এলাকায় ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযুক্ত ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবিএফ। অন্যদিকে, ইউপি সদস্য দাবি করেছেন, প্রতিবন্ধী যুবককে মারধরের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি পাশের গ্রামের ইয়াসিন ও আরাফাত নামের দুই যুবকের সঙ্গে ইউপি সদস্য সালেয়া বেগমের মেজো ছেলে আলাউদ্দিন হোসেনের কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে আলাউদ্দিনের সঙ্গে বাকবিতণ্ডার সময় তাকে ‘নেশাজীবী’ বলে মন্তব্য করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট যুবকের দাবি।

বিষয়টি জানতে পেরে ইউপি সদস্য সালেয়া বেগম তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাটি মীমাংসা করেন। তবে অভিযোগ, মীমাংসার পর তিনি গ্রামের মানুষকে উদ্দেশ্য করে একাধিকবার গালিগালাজ করেন এবং সবাইকে নেশাখোর বলে মন্তব্য করেন।

এ সময় স্থানীয় দোকানদার রবিউল ইসলাম প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, গ্রামের সবাই খারাপ হতে পারে না। এ নিয়ে উভয়ের মধ্যে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে ইউপি সদস্য রবিউলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘তুই কি আমাকে মারবি? এই গ্রামে কার ক্ষমতা আছে দেখি!’

এ সময় রবিউল ইসলামের ভাই নজরুল ইসলামের ছেলে শারীরিক প্রতিবন্ধী নাছির হোসেন (২০) দোকানের সামনে বসে ছিলেন। স্থানীয়দের দাবি, নাছির শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে স্পষ্টভাবে কথা বলতে পারেন না। তিনি ইউপি সদস্যকে উদ্দেশ্য করে বলেন, কাকি, সামান্য বিষয় নিয়ে ঝগড়া করেন না।

অভিযোগ রয়েছে, এরপরই ইউপি সদস্য নাছিরকে এলোপাতাড়ি মারধর করেন এবং মাটিতে ফেলে নির্যাতন চালান। পুরো ঘটনার ভিডিও মোবাইল ফোনে ধারণ করেন দোকানদার রবিউল ইসলাম।

প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, নাছিরকে মারধরের দৃশ্য আড়াল করতে ইউপি সদস্য সালেয়া বেগমসহ ১০ থেকে ১২ জন নারী ঘটনাস্থল ঘিরে রাখেন। পরে ভিডিও ধারণের বিষয়টি বুঝতে পেরে স্থানীয় বিএনপির সভাপতি ও কয়েকজন নারী নাছিরকে সেখান থেকে সরিয়ে নেন।

এরপর ইউপি সদস্যের এক ভাসুর ঘটনাস্থলে এসে আবার উত্তেজনা সৃষ্টি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সময় নজরুল ইসলাম তাকে দুটি ঘুষি মারেন। পরে ওই ব্যক্তি ও তার সঙ্গে থাকা কয়েকজন নজরুল ইসলামকে মারধর করেন। এতে আবারও সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়।

পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ইব্রাহিম হোসেন দুই পক্ষকে আলাদা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।

স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতিবন্ধী নাছির সহজ-সরল ও হাসিখুশি স্বভাবের হওয়ায় এলাকার মানুষের কাছে বেশ পরিচিত। তার ওপর হামলার অভিযোগে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় আইনি পদক্ষেপ নিতে স্থানীয়রা অর্থ সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নাছিরকে মারধরের ঘটনার পর বিষয়টি ধামাচাপা দিতে ইউপি সদস্য সালেয়া বেগম নিজের পায়ে পুরোনো আঘাতের ঘটনাকে সামনে এনে প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করেন।

তবে ইউপি সদস্যের দাবি, তাকে মারধর করে পা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে, ঘটনাটি প্রকাশ না করতে সাংবাদিকদের অর্থ দিয়ে সংবাদ বন্ধের চেষ্টা করেন ইউপি সদস্য। গণমাধ্যমের সঙ্গে মুঠোফোনে কথোপকথনে সংবাদ প্রকাশ বন্ধের বিষয়ে তিনি কথা বলেছেন বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। এ সংক্রান্ত একটি কল রেকর্ড সংরক্ষিত থাকার কথাও জানিয়েছেন তারা। তবে এ অভিযোগের স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ইউপি সদস্য সালেয়া বেগমকে স্থানীয় গ্রাম্য চিকিৎসক ডা. রফিকুল ইসলাম (রফিক) চিকিৎসা দিচ্ছিলেন। বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করায় মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে ইউপি সদস্যের পায়ের আঘাতের চিকিৎসা চলছিল।

তিনি বলেন, আমি আগেই তাকে এক্স-রে করাতে বলেছিলাম। কারণ হাড়ের ভেতরে আঘাত থাকার আশঙ্কা ছিল।

চিকিৎসক আরও জানান, ঘটনাস্থলটি তার চেম্বারের পাশেই হলেও ঘটনার দিন তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। মারধরের বিষয়টি পরে শুনেছেন।

তবে পুরোনো আঘাতকে কেন্দ্র করে পারিবারিক জমিজমা সংক্রান্ত ক্ষোভ থেকে ইউপি সদস্য অভিযোগ করেছেন বলে তিনি ধারণা প্রকাশ করেন। এটি চিকিৎসকের ব্যক্তিগত ধারণা; অভিযোগের সত্যতা তদন্তসাপেক্ষ।

এ ঘটনায় মানবাধিকার সংস্থা এবিএফ’র জেলা কার্যালয়ে প্রথমে মৌখিক এবং পরে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়। পাশাপাশি মারধরের ভিডিও ফুটেজও সংস্থাটির কাছে পাঠানো হয়েছে।

সংস্থাটির দাবি, জেলা ও উপজেলা অনুসন্ধানী শাখা বিষয়টি অনুসন্ধান করে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছে। প্রতিবন্ধী যুবকের ওপর এমন নির্যাতনের অভিযোগে স্থানীয় সুশীল সমাজের পাশাপাশি মানবাধিকার সংস্থাটিও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।

এবিএফ’র অনুসন্ধানী ইনচার্জ মো. রুস্তম হোসেন বলেন, একজন ইউপি সদস্যের দায়িত্ব আইন রক্ষা করা। অথচ তার বিরুদ্ধেই একজন প্রতিবন্ধীকে অমানবিকভাবে মারধরের অভিযোগ উঠেছে।

তিনি জানান, স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯-এর ৩৪ ধারার আলোকে অভিযুক্ত ইউপি সদস্যের সাময়িক বরখাস্ত ও অপসারণের দাবি জানিয়ে আদালতে পৃথক দুটি মামলা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনার বরাবর আবেদন পাঠানো হবে বলে জানান তিনি।

মণিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, ঘটনার দিন ইউপি সদস্য সালেয়া খাতুন তাকে মুঠোফোনে মৌখিক অভিযোগ করেন। ইউপি সদস্যের দাবি ছিল, তাকে মারধর করা হয়েছে এবং এতে তার পায়ে আঘাত লেগেছে।

ইউএনও বলেন, আমি তাকে লিখিত অভিযোগ দিতে বললে তিনি একটি লিখিত আবেদন জমা দেন। অভিযোগটি মণিরামপুর থানার ওসির কাছে পাঠিয়ে তদন্তপূর্বক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, প্রতিবন্ধী নাছিরকে মারধরের বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত ছিলাম না। নাছিরের পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে এবং তদন্তে ইউপি সদস্য দোষী প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অভিযুক্ত ইউপি সদস্য সালেয়া বেগম প্রতিবন্ধী নাছিরকে মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

তিনি বলেন, প্রতিবন্ধী নাছিরকে আমি মারধর করিনি। ঘটনা সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমাকে তারা মারধর করে পা ভেঙে দিয়েছে। আমি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর দরখাস্ত দিয়েছি। আশা করি, আমার ওপর হামলাকারীরা গ্রেপ্তার হবে।

২ নম্বর কাশিমনগর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক ও উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সেলিম রেজা জানান, মহিলা ইউপি সদস্য সালেয়া খাতুন মুঠোফোনে তাকে মারধর করে পা ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ করেছিলেন। বিষয়টি তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবহিত করেন।

তিনি বলেন, ইউপি সদস্য লিখিত অভিযোগ করেছেন। বর্তমানে পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করছে। তার পায়ে আগে থেকেই আঘাত ছিল কি না, কিংবা প্রতিবন্ধী নাছিরকে মারধরের ঘটনা সম্পর্কে আমি জানতাম না। এমন অমানবিক ঘটনা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।

এ ঘটনায় প্রতিবন্ধী নাছিরের চাচা নজরুল ইসলাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর লিখিত আবেদন করেছেন। পরিবারের পক্ষ থেকে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং নাছিরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।

এদিকে, প্রতিবন্ধী যুবকের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ এবং পাল্টাপাল্টি অভিযোগের ঘটনায় এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ও লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটন করা হবে।

তবে অভিযুক্ত ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের তদন্তের ফল এবং আদালতের সিদ্ধান্তের আগে কাউকে দোষী হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করা যাবে না।

ট্যাগস :

তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা: ইউএনও

মনিরামপুরে ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে প্রতিবন্ধী যুবককে মারধরের অভিযোগ

আপডেট সময় : ০৯:৪১:১৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

যশোরের মণিরামপুর উপজেলার কাশিমনগর ইউনিয়নে শারীরিক প্রতিবন্ধী এক যুবককে মারধর ও নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে সংরক্ষিত মহিলা ইউপি সদস্য সালেয়া বেগমের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় এলাকায় ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযুক্ত ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবিএফ। অন্যদিকে, ইউপি সদস্য দাবি করেছেন, প্রতিবন্ধী যুবককে মারধরের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি পাশের গ্রামের ইয়াসিন ও আরাফাত নামের দুই যুবকের সঙ্গে ইউপি সদস্য সালেয়া বেগমের মেজো ছেলে আলাউদ্দিন হোসেনের কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে আলাউদ্দিনের সঙ্গে বাকবিতণ্ডার সময় তাকে ‘নেশাজীবী’ বলে মন্তব্য করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট যুবকের দাবি।

বিষয়টি জানতে পেরে ইউপি সদস্য সালেয়া বেগম তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাটি মীমাংসা করেন। তবে অভিযোগ, মীমাংসার পর তিনি গ্রামের মানুষকে উদ্দেশ্য করে একাধিকবার গালিগালাজ করেন এবং সবাইকে নেশাখোর বলে মন্তব্য করেন।

এ সময় স্থানীয় দোকানদার রবিউল ইসলাম প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, গ্রামের সবাই খারাপ হতে পারে না। এ নিয়ে উভয়ের মধ্যে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে ইউপি সদস্য রবিউলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘তুই কি আমাকে মারবি? এই গ্রামে কার ক্ষমতা আছে দেখি!’

এ সময় রবিউল ইসলামের ভাই নজরুল ইসলামের ছেলে শারীরিক প্রতিবন্ধী নাছির হোসেন (২০) দোকানের সামনে বসে ছিলেন। স্থানীয়দের দাবি, নাছির শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে স্পষ্টভাবে কথা বলতে পারেন না। তিনি ইউপি সদস্যকে উদ্দেশ্য করে বলেন, কাকি, সামান্য বিষয় নিয়ে ঝগড়া করেন না।

অভিযোগ রয়েছে, এরপরই ইউপি সদস্য নাছিরকে এলোপাতাড়ি মারধর করেন এবং মাটিতে ফেলে নির্যাতন চালান। পুরো ঘটনার ভিডিও মোবাইল ফোনে ধারণ করেন দোকানদার রবিউল ইসলাম।

প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, নাছিরকে মারধরের দৃশ্য আড়াল করতে ইউপি সদস্য সালেয়া বেগমসহ ১০ থেকে ১২ জন নারী ঘটনাস্থল ঘিরে রাখেন। পরে ভিডিও ধারণের বিষয়টি বুঝতে পেরে স্থানীয় বিএনপির সভাপতি ও কয়েকজন নারী নাছিরকে সেখান থেকে সরিয়ে নেন।

এরপর ইউপি সদস্যের এক ভাসুর ঘটনাস্থলে এসে আবার উত্তেজনা সৃষ্টি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সময় নজরুল ইসলাম তাকে দুটি ঘুষি মারেন। পরে ওই ব্যক্তি ও তার সঙ্গে থাকা কয়েকজন নজরুল ইসলামকে মারধর করেন। এতে আবারও সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়।

পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ইব্রাহিম হোসেন দুই পক্ষকে আলাদা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।

স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতিবন্ধী নাছির সহজ-সরল ও হাসিখুশি স্বভাবের হওয়ায় এলাকার মানুষের কাছে বেশ পরিচিত। তার ওপর হামলার অভিযোগে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় আইনি পদক্ষেপ নিতে স্থানীয়রা অর্থ সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নাছিরকে মারধরের ঘটনার পর বিষয়টি ধামাচাপা দিতে ইউপি সদস্য সালেয়া বেগম নিজের পায়ে পুরোনো আঘাতের ঘটনাকে সামনে এনে প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করেন।

তবে ইউপি সদস্যের দাবি, তাকে মারধর করে পা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে, ঘটনাটি প্রকাশ না করতে সাংবাদিকদের অর্থ দিয়ে সংবাদ বন্ধের চেষ্টা করেন ইউপি সদস্য। গণমাধ্যমের সঙ্গে মুঠোফোনে কথোপকথনে সংবাদ প্রকাশ বন্ধের বিষয়ে তিনি কথা বলেছেন বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। এ সংক্রান্ত একটি কল রেকর্ড সংরক্ষিত থাকার কথাও জানিয়েছেন তারা। তবে এ অভিযোগের স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ইউপি সদস্য সালেয়া বেগমকে স্থানীয় গ্রাম্য চিকিৎসক ডা. রফিকুল ইসলাম (রফিক) চিকিৎসা দিচ্ছিলেন। বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করায় মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে ইউপি সদস্যের পায়ের আঘাতের চিকিৎসা চলছিল।

তিনি বলেন, আমি আগেই তাকে এক্স-রে করাতে বলেছিলাম। কারণ হাড়ের ভেতরে আঘাত থাকার আশঙ্কা ছিল।

চিকিৎসক আরও জানান, ঘটনাস্থলটি তার চেম্বারের পাশেই হলেও ঘটনার দিন তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। মারধরের বিষয়টি পরে শুনেছেন।

তবে পুরোনো আঘাতকে কেন্দ্র করে পারিবারিক জমিজমা সংক্রান্ত ক্ষোভ থেকে ইউপি সদস্য অভিযোগ করেছেন বলে তিনি ধারণা প্রকাশ করেন। এটি চিকিৎসকের ব্যক্তিগত ধারণা; অভিযোগের সত্যতা তদন্তসাপেক্ষ।

এ ঘটনায় মানবাধিকার সংস্থা এবিএফ’র জেলা কার্যালয়ে প্রথমে মৌখিক এবং পরে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়। পাশাপাশি মারধরের ভিডিও ফুটেজও সংস্থাটির কাছে পাঠানো হয়েছে।

সংস্থাটির দাবি, জেলা ও উপজেলা অনুসন্ধানী শাখা বিষয়টি অনুসন্ধান করে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছে। প্রতিবন্ধী যুবকের ওপর এমন নির্যাতনের অভিযোগে স্থানীয় সুশীল সমাজের পাশাপাশি মানবাধিকার সংস্থাটিও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।

এবিএফ’র অনুসন্ধানী ইনচার্জ মো. রুস্তম হোসেন বলেন, একজন ইউপি সদস্যের দায়িত্ব আইন রক্ষা করা। অথচ তার বিরুদ্ধেই একজন প্রতিবন্ধীকে অমানবিকভাবে মারধরের অভিযোগ উঠেছে।

তিনি জানান, স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯-এর ৩৪ ধারার আলোকে অভিযুক্ত ইউপি সদস্যের সাময়িক বরখাস্ত ও অপসারণের দাবি জানিয়ে আদালতে পৃথক দুটি মামলা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনার বরাবর আবেদন পাঠানো হবে বলে জানান তিনি।

মণিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, ঘটনার দিন ইউপি সদস্য সালেয়া খাতুন তাকে মুঠোফোনে মৌখিক অভিযোগ করেন। ইউপি সদস্যের দাবি ছিল, তাকে মারধর করা হয়েছে এবং এতে তার পায়ে আঘাত লেগেছে।

ইউএনও বলেন, আমি তাকে লিখিত অভিযোগ দিতে বললে তিনি একটি লিখিত আবেদন জমা দেন। অভিযোগটি মণিরামপুর থানার ওসির কাছে পাঠিয়ে তদন্তপূর্বক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, প্রতিবন্ধী নাছিরকে মারধরের বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত ছিলাম না। নাছিরের পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে এবং তদন্তে ইউপি সদস্য দোষী প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অভিযুক্ত ইউপি সদস্য সালেয়া বেগম প্রতিবন্ধী নাছিরকে মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

তিনি বলেন, প্রতিবন্ধী নাছিরকে আমি মারধর করিনি। ঘটনা সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমাকে তারা মারধর করে পা ভেঙে দিয়েছে। আমি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর দরখাস্ত দিয়েছি। আশা করি, আমার ওপর হামলাকারীরা গ্রেপ্তার হবে।

২ নম্বর কাশিমনগর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক ও উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সেলিম রেজা জানান, মহিলা ইউপি সদস্য সালেয়া খাতুন মুঠোফোনে তাকে মারধর করে পা ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ করেছিলেন। বিষয়টি তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবহিত করেন।

তিনি বলেন, ইউপি সদস্য লিখিত অভিযোগ করেছেন। বর্তমানে পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করছে। তার পায়ে আগে থেকেই আঘাত ছিল কি না, কিংবা প্রতিবন্ধী নাছিরকে মারধরের ঘটনা সম্পর্কে আমি জানতাম না। এমন অমানবিক ঘটনা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।

এ ঘটনায় প্রতিবন্ধী নাছিরের চাচা নজরুল ইসলাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর লিখিত আবেদন করেছেন। পরিবারের পক্ষ থেকে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং নাছিরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।

এদিকে, প্রতিবন্ধী যুবকের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ এবং পাল্টাপাল্টি অভিযোগের ঘটনায় এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ও লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটন করা হবে।

তবে অভিযুক্ত ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের তদন্তের ফল এবং আদালতের সিদ্ধান্তের আগে কাউকে দোষী হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করা যাবে না।