ঢাকা ০৬:৪৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬, ১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সিইটিপির ব্যর্থতায় সংকটে চামড়া শিল্প

দেশের অন্যতম রপ্তানিমুখী শিল্প চামড়া খাত এখন বহুমুখী সংকটে। সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে স্থাপিত কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নির্মিত না হওয়ায় অধিকাংশ ট্যানারি আন্তর্জাতিক সনদ অর্জন করতে পারছে না। ফলে একের পর এক হারিয়েছে বৈশ্বিক বাজার। বিদেশি ক্রেতাদের আগ্রহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়ার দামও নেমে এসেছে তলানিতে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত সাভারের হেমায়েতপুরে অবস্থিত বিসিক চামড়া শিল্পনগরীতে প্রায় ৫ লাখ ৩৩ হাজার পিস কাঁচা চামড়া এসেছে। ট্যানারি মালিকদের দাবি, তারা এসব চামড়া ৫০০ থেকে ৯০০ টাকা দরে কিনেছেন। তবে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে একটি গরুর চামড়া মাত্র ২০০ টাকাতেও বিক্রি করতে হয়েছে।

পরিবেশ দূষণ রোধ এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে ২০১৭ সালে ঢাকার হাজারীবাগ থেকে ১৬০টি ট্যানারি সাভারের বিসিক চামড়া শিল্পনগরীতে স্থানান্তর করা হয়। পরিকল্পনা ছিল, সব ট্যানারির তরল ও কঠিন বর্জ্য পাইপলাইনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগারে গিয়ে পরিশোধিত হবে। এর ফলে ট্যানারিগুলো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ’ (এলডব্লিউজি) সনদ অর্জন করতে পারবে এবং রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ হবে।

কিন্তু দীর্ঘদিন পরও সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি। ট্যানারি মালিকদের অভিযোগ, সিইটিপি নির্মাণে দায়িত্বপ্রাপ্ত চীনা প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে শিল্পনগরীর বর্জ্য যথাযথভাবে পরিশোধন হচ্ছে না। এতে একদিকে পরিবেশ দূষণ বাড়ছে, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পাশের ধলেশ্বরী নদী।

এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে রপ্তানি বাজারে। বর্তমানে শিল্পনগরীর শতাধিক ট্যানারির মধ্যে মাত্র একটি ট্যানারি এলডব্লিউজি সনদ পেয়েছে। ফলে ইউরোপ ও আমেরিকার বড় বড় ক্রেতারা বাংলাদেশি চামড়া কেনা থেকে সরে গেছেন। বর্তমানে প্রধানত চীনই বাংলাদেশের চামড়ার অন্যতম প্রধান ক্রেতা হিসেবে রয়েছে।

ট্যানারি মালিকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজার সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। একটি চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ, রাসায়নিক ব্যবহার, শ্রমিকের মজুরি ও প্রক্রিয়াজাতকরণসহ মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি বর্গফুট চামড়া সর্বোচ্চ ৭০ সেন্ট দরে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয়ই উঠছে না।

আজমির লেদারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শহীদ উল্লাহ বলেন, “বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে ট্যানারি পরিচালনা করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতা না থাকায় চামড়ার ন্যায্য মূল্য পাওয়া যাচ্ছে না। সিইটিপির সমস্যার সমাধান না হলে এই সংকট কাটবে না।”

চামড়া শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকার নতুন করে আধুনিক সিইটিপি নির্মাণের উদ্যোগের পাশাপাশি ট্যানারিগুলোকে নিজস্ব এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ইটিপি) স্থাপনের পরামর্শ দিয়েছে। ইতোমধ্যে ছয়টি ট্যানারিকে ইটিপি স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সদর ট্যানারি ও বে ট্যানারি নিজস্ব ইটিপি স্থাপন করেছে। তবে বাকি চারটি ট্যানারি এখনও তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি।

তবে ট্যানারি মালিকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, কেন্দ্রীয় সিইটিপির সমস্যা সমাধান ছাড়া পৃথক ইটিপি স্থাপন খুব বেশি সুফল বয়ে আনবে না। তাদের মতে, ইটিপিতে শুধু তরল বর্জ্য পরিশোধন করা যায়। কিন্তু কঠিন বর্জ্য পরিশোধনের জন্য সিইটিপির ওপরই নির্ভর করতে হয়। এছাড়া একটি ইটিপি স্থাপনে শত কোটি টাকার বেশি ব্যয় হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান এ উদ্যোগ নিতে পারছে না।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহ-সভাপতি সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, “চামড়া শিল্পকে রক্ষা করতে হলে সবার আগে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সিইটিপি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় রপ্তানি বাজার পুনরুদ্ধার করা কঠিন হবে।”

এদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, কাঁচা চামড়ার মান কমে যাওয়াও দরপতনের অন্যতম কারণ। সাম্প্রতিক সময়ে পশুর শরীরে লাম্পি স্কিন ডিজিজের প্রকোপ বেড়েছে। এর ফলে সংগ্রহ করা চামড়ার প্রায় ২৫ শতাংশই রপ্তানির অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি চামড়া ছাড়ানোর সময় অসাবধানতার কারণে অতিরিক্ত অংশ কেটে ফেলার ঘটনাও ঘটে। এতে চামড়ার মান ও পুরুত্ব নষ্ট হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে এর মূল্য কমে যায়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সাভার চামড়া শিল্পনগরীর সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হয়ে দাঁড়িয়েছে কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার প্রকল্প। নতুন সিইটিপি নির্মাণ এবং পৃথক ইটিপি স্থাপনের উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে চামড়া শিল্পে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসে কি না, এখন সেটিই দেখার অপেক্ষা।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

সিইটিপির ব্যর্থতায় সংকটে চামড়া শিল্প

আপডেট সময় : ০১:৫০:০৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২ জুন ২০২৬

দেশের অন্যতম রপ্তানিমুখী শিল্প চামড়া খাত এখন বহুমুখী সংকটে। সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে স্থাপিত কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নির্মিত না হওয়ায় অধিকাংশ ট্যানারি আন্তর্জাতিক সনদ অর্জন করতে পারছে না। ফলে একের পর এক হারিয়েছে বৈশ্বিক বাজার। বিদেশি ক্রেতাদের আগ্রহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়ার দামও নেমে এসেছে তলানিতে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত সাভারের হেমায়েতপুরে অবস্থিত বিসিক চামড়া শিল্পনগরীতে প্রায় ৫ লাখ ৩৩ হাজার পিস কাঁচা চামড়া এসেছে। ট্যানারি মালিকদের দাবি, তারা এসব চামড়া ৫০০ থেকে ৯০০ টাকা দরে কিনেছেন। তবে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে একটি গরুর চামড়া মাত্র ২০০ টাকাতেও বিক্রি করতে হয়েছে।

পরিবেশ দূষণ রোধ এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে ২০১৭ সালে ঢাকার হাজারীবাগ থেকে ১৬০টি ট্যানারি সাভারের বিসিক চামড়া শিল্পনগরীতে স্থানান্তর করা হয়। পরিকল্পনা ছিল, সব ট্যানারির তরল ও কঠিন বর্জ্য পাইপলাইনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগারে গিয়ে পরিশোধিত হবে। এর ফলে ট্যানারিগুলো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ’ (এলডব্লিউজি) সনদ অর্জন করতে পারবে এবং রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ হবে।

কিন্তু দীর্ঘদিন পরও সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি। ট্যানারি মালিকদের অভিযোগ, সিইটিপি নির্মাণে দায়িত্বপ্রাপ্ত চীনা প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে শিল্পনগরীর বর্জ্য যথাযথভাবে পরিশোধন হচ্ছে না। এতে একদিকে পরিবেশ দূষণ বাড়ছে, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পাশের ধলেশ্বরী নদী।

এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে রপ্তানি বাজারে। বর্তমানে শিল্পনগরীর শতাধিক ট্যানারির মধ্যে মাত্র একটি ট্যানারি এলডব্লিউজি সনদ পেয়েছে। ফলে ইউরোপ ও আমেরিকার বড় বড় ক্রেতারা বাংলাদেশি চামড়া কেনা থেকে সরে গেছেন। বর্তমানে প্রধানত চীনই বাংলাদেশের চামড়ার অন্যতম প্রধান ক্রেতা হিসেবে রয়েছে।

ট্যানারি মালিকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজার সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। একটি চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ, রাসায়নিক ব্যবহার, শ্রমিকের মজুরি ও প্রক্রিয়াজাতকরণসহ মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি বর্গফুট চামড়া সর্বোচ্চ ৭০ সেন্ট দরে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয়ই উঠছে না।

আজমির লেদারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শহীদ উল্লাহ বলেন, “বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে ট্যানারি পরিচালনা করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতা না থাকায় চামড়ার ন্যায্য মূল্য পাওয়া যাচ্ছে না। সিইটিপির সমস্যার সমাধান না হলে এই সংকট কাটবে না।”

চামড়া শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকার নতুন করে আধুনিক সিইটিপি নির্মাণের উদ্যোগের পাশাপাশি ট্যানারিগুলোকে নিজস্ব এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ইটিপি) স্থাপনের পরামর্শ দিয়েছে। ইতোমধ্যে ছয়টি ট্যানারিকে ইটিপি স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সদর ট্যানারি ও বে ট্যানারি নিজস্ব ইটিপি স্থাপন করেছে। তবে বাকি চারটি ট্যানারি এখনও তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি।

তবে ট্যানারি মালিকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, কেন্দ্রীয় সিইটিপির সমস্যা সমাধান ছাড়া পৃথক ইটিপি স্থাপন খুব বেশি সুফল বয়ে আনবে না। তাদের মতে, ইটিপিতে শুধু তরল বর্জ্য পরিশোধন করা যায়। কিন্তু কঠিন বর্জ্য পরিশোধনের জন্য সিইটিপির ওপরই নির্ভর করতে হয়। এছাড়া একটি ইটিপি স্থাপনে শত কোটি টাকার বেশি ব্যয় হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান এ উদ্যোগ নিতে পারছে না।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহ-সভাপতি সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, “চামড়া শিল্পকে রক্ষা করতে হলে সবার আগে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সিইটিপি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় রপ্তানি বাজার পুনরুদ্ধার করা কঠিন হবে।”

এদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, কাঁচা চামড়ার মান কমে যাওয়াও দরপতনের অন্যতম কারণ। সাম্প্রতিক সময়ে পশুর শরীরে লাম্পি স্কিন ডিজিজের প্রকোপ বেড়েছে। এর ফলে সংগ্রহ করা চামড়ার প্রায় ২৫ শতাংশই রপ্তানির অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি চামড়া ছাড়ানোর সময় অসাবধানতার কারণে অতিরিক্ত অংশ কেটে ফেলার ঘটনাও ঘটে। এতে চামড়ার মান ও পুরুত্ব নষ্ট হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে এর মূল্য কমে যায়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সাভার চামড়া শিল্পনগরীর সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হয়ে দাঁড়িয়েছে কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার প্রকল্প। নতুন সিইটিপি নির্মাণ এবং পৃথক ইটিপি স্থাপনের উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে চামড়া শিল্পে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসে কি না, এখন সেটিই দেখার অপেক্ষা।