ঢাকা ১১:৫২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬, ২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
এক হাতে স্টেনগান, অন্য হাতে ক্যামেরা

রণাঙ্গনের দুর্লভ ইতিহাস ধরে রেখেছিলেন এস এম সফি

দর্পণ ডেক্স
  • আপডেট সময় : ১০:১৮:৩৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬
  • / ৩২ বার পঠিত

এক হাতে স্টেনগান, অন্য হাতে ক্যামেরা। একদিকে শত্রুর বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই, অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা, বীরত্ব আর প্রতিরোধের মুহূর্তগুলো ক্যামেরায় বন্দী করা। একাত্তরের রণাঙ্গনে এভাবেই অস্ত্র ও ক্যামেরা হাতে যুদ্ধ করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধা ও ফটোসাংবাদিক এস এম সফি। তাঁর ক্যামেরায় ধারণ করা অসংখ্য ছবি আজ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ আলোকচিত্র দলিল।

১৯৩৪ সালের ১০ আগস্ট যশোর শহরের চুড়িপট্টিতে জন্মগ্রহণ করেন এস এম সফি। শৈশবে ভারতের জলপাইগুড়িতে একটি স্টুডিওতে কাজ করার সময় তাঁর হাতে ক্যামেরা ওঠে। সেখান থেকেই আলোকচিত্রের প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। ১৯৬২ সালে দেশে ফিরে যশোরে স্থায়ী হন তিনি। পরের বছর শহরের রেল রোডে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ফটো ফোকাস’ নামে একটি স্টুডিও। আলোকচিত্রের পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় ছিলেন তিনি।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে আর নিজেকে ঘরে আটকে রাখেননি এস এম সফি। অস্ত্র হাতে যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে। একই সঙ্গে ক্যামেরা নিয়েও ছুটে বেড়ান রণাঙ্গনে। যুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি পাঁচ শতাধিক ছবি তোলেন। তাঁর ছবিতে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের নৃশংসতা, যুদ্ধের নানা ঘটনা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসিকতার চিত্র উঠে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর স্ত্রীও সহযোদ্ধা হিসেবে অংশ নেন। ফলে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তাঁদের পারিবারিক জীবনেও গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছিল।

যুদ্ধের পরও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণে কাজ করে গেছেন এস এম সফি। ১৯৭৪ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে তাঁর আলোকচিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘদিনের সংগ্রহ থেকে ২০০৬ সালে প্রকাশিত হয় মুক্তিযুদ্ধের আলোকচিত্রের অ্যালবাম ‘আলোকচিত্রে একাত্তর’। অ্যালবামটি মুক্তিযুদ্ধের দৃশ্যমান ইতিহাস সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

মুক্তিযুদ্ধে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯৬ সালে ঢাকায় জাতীয় সংবর্ধনা পান এস এম সফি। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সংগঠন ‘চেতনা’সহ বিভিন্ন ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন। ১৯৯৭ সালের ১০ আগস্ট ৬৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন এস এম সফি। তবে তাঁর ক্যামেরায় বন্দী একাত্তরের সেই দিনগুলো আজও কথা বলে। যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ, মানুষের কষ্ট, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ এবং বিজয়ের আকাঙ্ক্ষার সেই দৃশ্যগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের বাস্তবতা জানিয়ে যাচ্ছে।

অস্ত্র হাতে তিনি লড়েছিলেন দেশের স্বাধীনতার জন্য, আর ক্যামেরা হাতে রেখে গেছেন সেই লড়াইয়ের দৃশ্যমান ইতিহাস। তাই এস এম সফির আলোকচিত্র শুধু ছবি নয়, একাত্তরের রক্তাক্ত ইতিহাসের অমূল্য দলিল।

ট্যাগস :

এক হাতে স্টেনগান, অন্য হাতে ক্যামেরা

রণাঙ্গনের দুর্লভ ইতিহাস ধরে রেখেছিলেন এস এম সফি

আপডেট সময় : ১০:১৮:৩৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬

এক হাতে স্টেনগান, অন্য হাতে ক্যামেরা। একদিকে শত্রুর বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই, অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা, বীরত্ব আর প্রতিরোধের মুহূর্তগুলো ক্যামেরায় বন্দী করা। একাত্তরের রণাঙ্গনে এভাবেই অস্ত্র ও ক্যামেরা হাতে যুদ্ধ করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধা ও ফটোসাংবাদিক এস এম সফি। তাঁর ক্যামেরায় ধারণ করা অসংখ্য ছবি আজ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ আলোকচিত্র দলিল।

১৯৩৪ সালের ১০ আগস্ট যশোর শহরের চুড়িপট্টিতে জন্মগ্রহণ করেন এস এম সফি। শৈশবে ভারতের জলপাইগুড়িতে একটি স্টুডিওতে কাজ করার সময় তাঁর হাতে ক্যামেরা ওঠে। সেখান থেকেই আলোকচিত্রের প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। ১৯৬২ সালে দেশে ফিরে যশোরে স্থায়ী হন তিনি। পরের বছর শহরের রেল রোডে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ফটো ফোকাস’ নামে একটি স্টুডিও। আলোকচিত্রের পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় ছিলেন তিনি।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে আর নিজেকে ঘরে আটকে রাখেননি এস এম সফি। অস্ত্র হাতে যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে। একই সঙ্গে ক্যামেরা নিয়েও ছুটে বেড়ান রণাঙ্গনে। যুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি পাঁচ শতাধিক ছবি তোলেন। তাঁর ছবিতে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের নৃশংসতা, যুদ্ধের নানা ঘটনা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসিকতার চিত্র উঠে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর স্ত্রীও সহযোদ্ধা হিসেবে অংশ নেন। ফলে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তাঁদের পারিবারিক জীবনেও গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছিল।

যুদ্ধের পরও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণে কাজ করে গেছেন এস এম সফি। ১৯৭৪ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে তাঁর আলোকচিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘদিনের সংগ্রহ থেকে ২০০৬ সালে প্রকাশিত হয় মুক্তিযুদ্ধের আলোকচিত্রের অ্যালবাম ‘আলোকচিত্রে একাত্তর’। অ্যালবামটি মুক্তিযুদ্ধের দৃশ্যমান ইতিহাস সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

মুক্তিযুদ্ধে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯৬ সালে ঢাকায় জাতীয় সংবর্ধনা পান এস এম সফি। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সংগঠন ‘চেতনা’সহ বিভিন্ন ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন। ১৯৯৭ সালের ১০ আগস্ট ৬৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন এস এম সফি। তবে তাঁর ক্যামেরায় বন্দী একাত্তরের সেই দিনগুলো আজও কথা বলে। যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ, মানুষের কষ্ট, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ এবং বিজয়ের আকাঙ্ক্ষার সেই দৃশ্যগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের বাস্তবতা জানিয়ে যাচ্ছে।

অস্ত্র হাতে তিনি লড়েছিলেন দেশের স্বাধীনতার জন্য, আর ক্যামেরা হাতে রেখে গেছেন সেই লড়াইয়ের দৃশ্যমান ইতিহাস। তাই এস এম সফির আলোকচিত্র শুধু ছবি নয়, একাত্তরের রক্তাক্ত ইতিহাসের অমূল্য দলিল।