ঢাকা ০৫:৫৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কালিয়ায় মধুমতির ভাঙনে বিলীনের পথে চর মধুপুর

নড়াইল সংবাদদাতা
  • আপডেট সময় : ০২:৫৯:৩৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬
  • / ২২ বার পঠিত

নড়াইলের কালিয়া উপজেলার নড়াগাতী থানার পহরডাঙ্গা ইউনিয়নের চর মধুপুর। একসময় মানুষের কোলাহল, ঘরবাড়ি, গাছপালা আর ফসলের মাঠে মুখর ছিল গ্রামটি। মধুমতি নদীর অব্যাহত ভাঙনে সেই চর মধুপুর এখন বিলীনের পথে। প্রতিদিনই নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে বসতভিটা ও আবাদি জমি। নদীর তীরে টিকে থাকা পরিবারগুলোর মধ্যে দেখা দিয়েছে শেষ আশ্রয়টুকু হারানোর আতঙ্ক।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে মধুমতির ভাঙনে চর মধুপুরের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ইতোমধ্যে অনেক পরিবার বসতভিটা হারিয়েছে। কেউ ঘরবাড়ি সরিয়ে নিয়েছেন নিরাপদ স্থানে, আবার কেউ শেষ সম্বলটুকু আঁকড়ে ধরে আছেন। ভাঙনের প্রকোপ বাড়লেও স্থায়ী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না থাকায় সংকট দিন দিন তীব্র হচ্ছে বলে অভিযোগ তাঁদের।

সরেজমিনে দেখা যায়, নদীর তীরবর্তী কয়েকটি বাড়ি মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। অনেক জায়গায় নদীর স্রোত চলে এসেছে বসতভিটার একেবারে কাছে। দিনের বেলায় ভাঙন চোখে পড়লেও রাতের অন্ধকারে আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়। হঠাৎ নদীর পাড় ধসে ঘরবাড়ি নদীতে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন অনেক পরিবার।

ভুক্তভোগী মিজান মল্লিক বলেন, সব হারিয়ে এখন শুধু পৈতৃক ভিটাটুকু আছে। সেটিও কখন নদীগর্ভে চলে যায়, সেই আতঙ্কে রাতদিন ঘুমাতে পারি না। আশপাশে আর বাড়ি নেই। এখন আমার বাড়িটিও কখন হারিয়ে যায়, সেই চিন্তায় আছি।

স্থানীয় বাসিন্দা আলহাজ্ব মল্লিক বলেন, জন্ম থেকেই এই ভাঙন দেখে আসছি। বছরের পর বছর নদীভাঙনে আমরা পরিবার নিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছি।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, একটি জনবসতি যখন ধীরে ধীরে নদীগর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে, তখন স্থায়ী নদীতীর সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ কতটা নেওয়া হয়েছে। তাঁদের দাবি, ভাঙনের পর ক্ষয়ক্ষতি বিবেচনার পরিবর্তে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা আগেই চিহ্নিত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

১০ নম্বর পহরডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মল্লিক মাহমুদুল ইসলাম বলেন, চর মধুপুরে নদীভাঙনের প্রকোপ অনেক বেড়েছে। দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য অনুরোধ করছি। ইতোমধ্যে কালিয়া উপজেলা প্রশাসনকে লিখিতভাবে বিষয়টি জানানো হয়েছে।

কালিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিন্নাতুল ইসলাম বলেন, চর মধুপুরের নদীভাঙনের বিষয়টি ইতোমধ্যে অবগত হয়েছি। দ্রুত যথাযথ কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করা হবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের জন্য জানানো হয়েছে।

এদিকে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে থাকার কথা জানিয়েছেন নড়াইল-১ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, চর মধুপুর গ্রামের নদীভাঙনকবলিত মানুষের দুঃখ-দুর্দশার বিষয়টি আমি জেনেছি। দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নদীভাঙনকবলিত এলাকার মানুষের পাশে অতীতেও ছিলাম, এখনো আছি এবং থাকব, ইনশাআল্লাহ।

তবে স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে মধুমতির ভাঙনে চর মধুপুরের অবশিষ্ট বসতভিটাগুলোও একে একে নদীগর্ভে চলে যেতে পারে। নদীভাঙনে শুধু একটি ঘর বা জমি হারায় না; এর সঙ্গে হারিয়ে যায় মানুষের স্মৃতি, গাছপালা, সামাজিক বন্ধন এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা ঠিকানা।

চর মধুপুরের বাসিন্দাদের দাবি, জরুরি ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ নদীতীর পরিদর্শন করে কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী জিওব্যাগসহ প্রকৌশলগত ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। একই সঙ্গে ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন ও জরুরি সহায়তার বিষয়টিও বিবেচনার দাবি তাঁদের।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, এখনই উদ্যোগ না নিলে মধুমতির ভাঙনে চর মধুপুরের অবশিষ্ট জনবসতিও হারিয়ে যেতে পারে। তখন মানচিত্রে হয়তো এলাকার নাম থাকবে, কিন্তু নদীগর্ভে হারিয়ে যাবে মানুষের বসতভিটা ও পূর্বপুরুষের স্মৃতিবিজড়িত ঠিকানা।

চর মধুপুরকে রক্ষায় সংশ্লিষ্ট পানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের দ্রুত, সমন্বিত এবং টেকসই উদ্যোগই এখন নদীপাড়ের মানুষের প্রধান প্রত্যাশা।

ট্যাগস :

কালিয়ায় মধুমতির ভাঙনে বিলীনের পথে চর মধুপুর

আপডেট সময় : ০২:৫৯:৩৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬

নড়াইলের কালিয়া উপজেলার নড়াগাতী থানার পহরডাঙ্গা ইউনিয়নের চর মধুপুর। একসময় মানুষের কোলাহল, ঘরবাড়ি, গাছপালা আর ফসলের মাঠে মুখর ছিল গ্রামটি। মধুমতি নদীর অব্যাহত ভাঙনে সেই চর মধুপুর এখন বিলীনের পথে। প্রতিদিনই নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে বসতভিটা ও আবাদি জমি। নদীর তীরে টিকে থাকা পরিবারগুলোর মধ্যে দেখা দিয়েছে শেষ আশ্রয়টুকু হারানোর আতঙ্ক।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে মধুমতির ভাঙনে চর মধুপুরের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ইতোমধ্যে অনেক পরিবার বসতভিটা হারিয়েছে। কেউ ঘরবাড়ি সরিয়ে নিয়েছেন নিরাপদ স্থানে, আবার কেউ শেষ সম্বলটুকু আঁকড়ে ধরে আছেন। ভাঙনের প্রকোপ বাড়লেও স্থায়ী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না থাকায় সংকট দিন দিন তীব্র হচ্ছে বলে অভিযোগ তাঁদের।

সরেজমিনে দেখা যায়, নদীর তীরবর্তী কয়েকটি বাড়ি মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। অনেক জায়গায় নদীর স্রোত চলে এসেছে বসতভিটার একেবারে কাছে। দিনের বেলায় ভাঙন চোখে পড়লেও রাতের অন্ধকারে আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়। হঠাৎ নদীর পাড় ধসে ঘরবাড়ি নদীতে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন অনেক পরিবার।

ভুক্তভোগী মিজান মল্লিক বলেন, সব হারিয়ে এখন শুধু পৈতৃক ভিটাটুকু আছে। সেটিও কখন নদীগর্ভে চলে যায়, সেই আতঙ্কে রাতদিন ঘুমাতে পারি না। আশপাশে আর বাড়ি নেই। এখন আমার বাড়িটিও কখন হারিয়ে যায়, সেই চিন্তায় আছি।

স্থানীয় বাসিন্দা আলহাজ্ব মল্লিক বলেন, জন্ম থেকেই এই ভাঙন দেখে আসছি। বছরের পর বছর নদীভাঙনে আমরা পরিবার নিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছি।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, একটি জনবসতি যখন ধীরে ধীরে নদীগর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে, তখন স্থায়ী নদীতীর সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ কতটা নেওয়া হয়েছে। তাঁদের দাবি, ভাঙনের পর ক্ষয়ক্ষতি বিবেচনার পরিবর্তে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা আগেই চিহ্নিত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

১০ নম্বর পহরডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মল্লিক মাহমুদুল ইসলাম বলেন, চর মধুপুরে নদীভাঙনের প্রকোপ অনেক বেড়েছে। দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য অনুরোধ করছি। ইতোমধ্যে কালিয়া উপজেলা প্রশাসনকে লিখিতভাবে বিষয়টি জানানো হয়েছে।

কালিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিন্নাতুল ইসলাম বলেন, চর মধুপুরের নদীভাঙনের বিষয়টি ইতোমধ্যে অবগত হয়েছি। দ্রুত যথাযথ কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করা হবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের জন্য জানানো হয়েছে।

এদিকে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে থাকার কথা জানিয়েছেন নড়াইল-১ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, চর মধুপুর গ্রামের নদীভাঙনকবলিত মানুষের দুঃখ-দুর্দশার বিষয়টি আমি জেনেছি। দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নদীভাঙনকবলিত এলাকার মানুষের পাশে অতীতেও ছিলাম, এখনো আছি এবং থাকব, ইনশাআল্লাহ।

তবে স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে মধুমতির ভাঙনে চর মধুপুরের অবশিষ্ট বসতভিটাগুলোও একে একে নদীগর্ভে চলে যেতে পারে। নদীভাঙনে শুধু একটি ঘর বা জমি হারায় না; এর সঙ্গে হারিয়ে যায় মানুষের স্মৃতি, গাছপালা, সামাজিক বন্ধন এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা ঠিকানা।

চর মধুপুরের বাসিন্দাদের দাবি, জরুরি ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ নদীতীর পরিদর্শন করে কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী জিওব্যাগসহ প্রকৌশলগত ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। একই সঙ্গে ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন ও জরুরি সহায়তার বিষয়টিও বিবেচনার দাবি তাঁদের।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, এখনই উদ্যোগ না নিলে মধুমতির ভাঙনে চর মধুপুরের অবশিষ্ট জনবসতিও হারিয়ে যেতে পারে। তখন মানচিত্রে হয়তো এলাকার নাম থাকবে, কিন্তু নদীগর্ভে হারিয়ে যাবে মানুষের বসতভিটা ও পূর্বপুরুষের স্মৃতিবিজড়িত ঠিকানা।

চর মধুপুরকে রক্ষায় সংশ্লিষ্ট পানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের দ্রুত, সমন্বিত এবং টেকসই উদ্যোগই এখন নদীপাড়ের মানুষের প্রধান প্রত্যাশা।