ঢাকা ১০:৪০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo শার্শায় কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক গ্রেপ্তার Logo বেনাপোলে ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি শরিফুল আটক, আদালতে প্রেরণ Logo মনিরামপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে খেয়াল খুশি মতো চেম্বার করেন ডাক্তারগণ Logo সাতক্ষীরায় সারের ডিলারশিপ নিয়ে রেজাউল ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচার Logo বড়দিয়া–মহাজন খেয়াঘাটে নদীভাঙনের তাণ্ডব Logo জনগণের যৌক্তিক দাবি উপেক্ষার চেষ্টা করছে সরকার: গোলাম পরওয়ার Logo ঝিকরগাছা পৌরবাসী স্বাস্থ্যঝুঁকিতে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বেহাল দশা Logo যশোরে ৭৫ লাখ টাকা কাবিন নিয়ে বিরোধ, সংবাদ সম্মেলন Logo খোলাডাঙ্গায় চারজনকে কুপিয়ে জখমের ঘটনায় প্রধান আসামি আটক Logo যশোরে সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোটের বিক্ষোভ সমাবেশ
সেবা না প্রহসন? নেবুলাইজার সলিউশন নেই এক মাস!

মনিরামপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে খেয়াল খুশি মতো চেম্বার করেন ডাক্তারগণ

এস এম তাজাম্মুল, মনিরামপুর (যশোর)
  • আপডেট সময় : ০৯:২৫:১৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬
  • / ১৯ বার পঠিত

চিকিৎসক নির্ধারিত সময়ে কক্ষে উপস্থিত না থাকা, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা-সামগ্রীর সংকট, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং নিরাপত্তাহীনতা, এমন নানা অভিযোগ উঠেছে যশোরের মণিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিরুদ্ধে। বিশেষ করে আবহাওয়াজনিত অসুস্থতায় আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত নেবুলাইজার সলিউশন এক মাস ধরে পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন এক রোগীর স্বজন।

এ ছাড়া বহির্বিভাগে চিকিৎসক না পাওয়া, রোগ নির্ণয়ে গাফিলতি এবং হাসপাতালের বিভিন্ন স্থানে ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকার অভিযোগও রয়েছে। এসব ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা। তাঁদের প্রশ্ন, সরকারি হাসপাতালে এসে যদি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সেবা না মেলে, তাহলে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়?

প্রতিবেদকের সরেজমিন পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গত শনিবার (১০ অক্টোবর) সকাল ১০টার পরও হাসপাতালের দ্বিতীয় তলার ২১১, ২১২ ও ২১৩ নম্বর কক্ষে চিকিৎসকদের উপস্থিতি দেখা যায়নি। আলট্রাসনোগ্রাফি ও স্টোররুমও তালাবদ্ধ ছিল। নিচতলার ১১৭ ও ১১৮ নম্বর কক্ষে একজন করে চিকিৎসক থাকলেও ১২০ নম্বর কক্ষটি ফাঁকা ছিল। শিশু কর্নার হিসেবে ব্যবহৃত ১২৫ নম্বর কক্ষে একজন চিকিৎসককে দেখা গেলেও ১২৬ নম্বর গাইনি কক্ষে চিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন না।

কয়েকটি কক্ষের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকেরা ওয়ার্ডে রাউন্ডে আছেন বলে জানানো হলেও তৃতীয় তলার পুরুষ ওয়ার্ডে চিকিৎসক ফরিদুল ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো চিকিৎসককে দেখা যায়নি বলে দাবি প্রতিবেদকের।

এ সময় চিকিৎসা নিতে আসা অনেক রোগীকে চিকিৎসকের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। কেউ দেয়ালে হেলান দিয়ে অপেক্ষা করছিলেন, কেউবা দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বসে পড়েন। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে গাইনি বিভাগের সামনে গর্ভবতী নারীদের দীর্ঘ সারি ছিল।

তবে হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসকদের উপস্থিতি ও দায়িত্ব পালনের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন।

হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা নিয়ে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন পৌরসভার তাহেরপুর ওয়ার্ডের ১০ মাস বয়সী শিশু বায়োজিতের মা নাজমুন নাহার।

তাঁর অভিযোগ, শিশুটিকে পরপর তিন দিন ১২৫ নম্বর কক্ষে চিকিৎসক ফাতেমার কাছে নেওয়া হলেও রোগের কারণ সম্পর্কে তাঁরা নিশ্চিত হতে পারেননি। এ সময় পাঁচটি পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। পরে শিশুটির শরীরে হামের কোনো লক্ষণ রয়েছে কি না, জানতে চাইলে চিকিৎসক তা নাকচ করে দেন বলে দাবি করেন তিনি।

নাজমুন নাহারের ভাষ্য, পরবর্তী সময়ে শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক চন্দ্র শেখর কুণ্ডু শিশুটির শরীরে হামের উপসর্গ রয়েছে এবং তার অবস্থা গুরুতর বলে জানান।

চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী, শুক্রবার (৯ অক্টোবর) শিশুটিকে নেবুলাইজার দেওয়ার জন্য স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট নার্সেরা জানান, নেবুলাইজার সলিউশনের সংকট চলছে। তাঁদের দাবি, প্রায় এক মাস ধরে এ সংকট রয়েছে।

হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা নিয়েও অভিযোগ করেছেন রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা।

প্রতিবেদকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শনিবার সকাল ১০টার পরও হাসপাতালের বহির্বিভাগ, দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার মেঝে এবং বারান্দায় ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকতে দেখা যায়। বারান্দায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল ডাবের খোসা। বিভিন্ন শয্যার নিচে ও আশপাশে ময়লার স্তূপও দেখা যায়।

রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, সকাল গড়িয়ে গেলেও পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা অনেক জায়গা পরিষ্কার করতে আসেননি।

মহিলা ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন এক নারী অভিযোগ করেন, বাথরুমে ময়লা-আবর্জনা জমে থাকায় দুর্গন্ধে প্রবেশ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাঁর ভাষ্য, বিশেষ করে গর্ভবতী নারী ও সদ্য সন্তান জন্ম দেওয়া মায়েদের জন্য এ পরিবেশ অত্যন্ত দুর্ভোগের।

হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা না গেলে রোগীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

হাসপাতালের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সূর্য ডোবার পর প্রধান ফটকসহ হাসপাতাল চত্বরের বিভিন্ন স্থানে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা থাকে না। এতে সন্ধ্যার পর হাসপাতালের ভেতরে ও বাইরে চলাচলকারী রোগী, স্বজন এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত নিরাপত্তাকর্মীদের সমস্যায় পড়তে হয়।

নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত আনসার সদস্যদের অভিযোগ, বিষয়টি একাধিকবার কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাঁদের দাবি, সন্ধ্যার পর হাসপাতালের বেষ্টনী ও প্রধান ফটকসংলগ্ন এলাকায় অন্ধকার থাকায় কে প্রবেশ করছেন বা বের হচ্ছেন, তা পর্যবেক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এ ছাড়া গত সেপ্টেম্বর মাসে হাসপাতাল থেকে এক নারী রোগীর স্বর্ণের চেইন ও অন্যান্য সামগ্রী চুরি এবং অরক্ষিত গ্যারেজ থেকে এক রোগীর স্বজনের মোটরসাইকেল চুরির অভিযোগ রয়েছে। হাসপাতালের শয্যার পাশ থেকেও মোবাইল ফোন চুরির ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-সামগ্রী পাওয়া নিয়েও অভিযোগ করেছেন রোগীর স্বজনেরা। গত রোববার (১১ অক্টোবর) উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান মিন্টুর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে মণিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক ইসিজি করার পরামর্শ দেন। পরে ইসিজি যন্ত্রের প্রতিবেদন নিয়ে অসংগতির অভিযোগ তোলেন তাঁর ছেলে তোহা।

তাঁর অভিযোগ, যন্ত্রটি সঠিক প্রতিবেদন দিচ্ছিল না। তবে যন্ত্রটির কার্যকারিতা যাচাই এবং চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি পরীক্ষা ছাড়া এ অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

একই দিন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা এক রোগীর স্বজন মাসুদ পারভেজ অভিযোগ করেন, প্রয়োজনীয় স্যালাইন কিনে আনার পরও স্যালাইন দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত সামান্য সরঞ্জাম পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে হাসপাতালের স্টোরকিপার সাইফুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, স্টকের বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার (ইউএইচএফপিও) সঙ্গে কথা বলতে হবে।

মণিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শয্যার তুলনায় রোগীর চাপ বেশি এবং চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকট রয়েছে এমন বক্তব্য আগেও দিয়েছেন হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. ফাইয়াজ আহমেদ ফয়সাল।

হাসপাতালসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, আবহাওয়াজনিত অসুস্থতায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় সম্প্রতি ভর্তি রোগীর চাপও বেড়েছে। তবে জনবল ও শয্যাসংকট থাকলেও নির্ধারিত সময়ে চিকিৎসক উপস্থিতি, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-সামগ্রী ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই বলে মনে করছেন রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা।

হাসপাতালের বিভিন্ন অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগের বিষয়ে মণিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সম্রাট হোসেনকে অবহিত করা হলে তিনি বিষয়গুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করবেন বলে জানিয়েছেন।

রোগী ও তাঁদের স্বজনদের প্রত্যাশা, অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি বহির্বিভাগে চিকিৎসকদের সময়মতো উপস্থিতি নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা-সামগ্রীর সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হবে।

সরকারি হাসপাতাল সাধারণ মানুষের চিকিৎসার অন্যতম ভরসাস্থল। সেখানে সেবার মান নিয়ে একের পর এক অভিযোগ উঠলে তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমেই নিশ্চিত হতে পারে রোগীদের কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা।

ট্যাগস :

সেবা না প্রহসন? নেবুলাইজার সলিউশন নেই এক মাস!

মনিরামপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে খেয়াল খুশি মতো চেম্বার করেন ডাক্তারগণ

আপডেট সময় : ০৯:২৫:১৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬

চিকিৎসক নির্ধারিত সময়ে কক্ষে উপস্থিত না থাকা, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা-সামগ্রীর সংকট, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং নিরাপত্তাহীনতা, এমন নানা অভিযোগ উঠেছে যশোরের মণিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিরুদ্ধে। বিশেষ করে আবহাওয়াজনিত অসুস্থতায় আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত নেবুলাইজার সলিউশন এক মাস ধরে পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন এক রোগীর স্বজন।

এ ছাড়া বহির্বিভাগে চিকিৎসক না পাওয়া, রোগ নির্ণয়ে গাফিলতি এবং হাসপাতালের বিভিন্ন স্থানে ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকার অভিযোগও রয়েছে। এসব ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা। তাঁদের প্রশ্ন, সরকারি হাসপাতালে এসে যদি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সেবা না মেলে, তাহলে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়?

প্রতিবেদকের সরেজমিন পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গত শনিবার (১০ অক্টোবর) সকাল ১০টার পরও হাসপাতালের দ্বিতীয় তলার ২১১, ২১২ ও ২১৩ নম্বর কক্ষে চিকিৎসকদের উপস্থিতি দেখা যায়নি। আলট্রাসনোগ্রাফি ও স্টোররুমও তালাবদ্ধ ছিল। নিচতলার ১১৭ ও ১১৮ নম্বর কক্ষে একজন করে চিকিৎসক থাকলেও ১২০ নম্বর কক্ষটি ফাঁকা ছিল। শিশু কর্নার হিসেবে ব্যবহৃত ১২৫ নম্বর কক্ষে একজন চিকিৎসককে দেখা গেলেও ১২৬ নম্বর গাইনি কক্ষে চিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন না।

কয়েকটি কক্ষের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকেরা ওয়ার্ডে রাউন্ডে আছেন বলে জানানো হলেও তৃতীয় তলার পুরুষ ওয়ার্ডে চিকিৎসক ফরিদুল ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো চিকিৎসককে দেখা যায়নি বলে দাবি প্রতিবেদকের।

এ সময় চিকিৎসা নিতে আসা অনেক রোগীকে চিকিৎসকের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। কেউ দেয়ালে হেলান দিয়ে অপেক্ষা করছিলেন, কেউবা দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বসে পড়েন। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে গাইনি বিভাগের সামনে গর্ভবতী নারীদের দীর্ঘ সারি ছিল।

তবে হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসকদের উপস্থিতি ও দায়িত্ব পালনের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন।

হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা নিয়ে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন পৌরসভার তাহেরপুর ওয়ার্ডের ১০ মাস বয়সী শিশু বায়োজিতের মা নাজমুন নাহার।

তাঁর অভিযোগ, শিশুটিকে পরপর তিন দিন ১২৫ নম্বর কক্ষে চিকিৎসক ফাতেমার কাছে নেওয়া হলেও রোগের কারণ সম্পর্কে তাঁরা নিশ্চিত হতে পারেননি। এ সময় পাঁচটি পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। পরে শিশুটির শরীরে হামের কোনো লক্ষণ রয়েছে কি না, জানতে চাইলে চিকিৎসক তা নাকচ করে দেন বলে দাবি করেন তিনি।

নাজমুন নাহারের ভাষ্য, পরবর্তী সময়ে শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক চন্দ্র শেখর কুণ্ডু শিশুটির শরীরে হামের উপসর্গ রয়েছে এবং তার অবস্থা গুরুতর বলে জানান।

চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী, শুক্রবার (৯ অক্টোবর) শিশুটিকে নেবুলাইজার দেওয়ার জন্য স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট নার্সেরা জানান, নেবুলাইজার সলিউশনের সংকট চলছে। তাঁদের দাবি, প্রায় এক মাস ধরে এ সংকট রয়েছে।

হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা নিয়েও অভিযোগ করেছেন রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা।

প্রতিবেদকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শনিবার সকাল ১০টার পরও হাসপাতালের বহির্বিভাগ, দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার মেঝে এবং বারান্দায় ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকতে দেখা যায়। বারান্দায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল ডাবের খোসা। বিভিন্ন শয্যার নিচে ও আশপাশে ময়লার স্তূপও দেখা যায়।

রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, সকাল গড়িয়ে গেলেও পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা অনেক জায়গা পরিষ্কার করতে আসেননি।

মহিলা ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন এক নারী অভিযোগ করেন, বাথরুমে ময়লা-আবর্জনা জমে থাকায় দুর্গন্ধে প্রবেশ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাঁর ভাষ্য, বিশেষ করে গর্ভবতী নারী ও সদ্য সন্তান জন্ম দেওয়া মায়েদের জন্য এ পরিবেশ অত্যন্ত দুর্ভোগের।

হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা না গেলে রোগীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

হাসপাতালের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সূর্য ডোবার পর প্রধান ফটকসহ হাসপাতাল চত্বরের বিভিন্ন স্থানে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা থাকে না। এতে সন্ধ্যার পর হাসপাতালের ভেতরে ও বাইরে চলাচলকারী রোগী, স্বজন এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত নিরাপত্তাকর্মীদের সমস্যায় পড়তে হয়।

নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত আনসার সদস্যদের অভিযোগ, বিষয়টি একাধিকবার কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাঁদের দাবি, সন্ধ্যার পর হাসপাতালের বেষ্টনী ও প্রধান ফটকসংলগ্ন এলাকায় অন্ধকার থাকায় কে প্রবেশ করছেন বা বের হচ্ছেন, তা পর্যবেক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এ ছাড়া গত সেপ্টেম্বর মাসে হাসপাতাল থেকে এক নারী রোগীর স্বর্ণের চেইন ও অন্যান্য সামগ্রী চুরি এবং অরক্ষিত গ্যারেজ থেকে এক রোগীর স্বজনের মোটরসাইকেল চুরির অভিযোগ রয়েছে। হাসপাতালের শয্যার পাশ থেকেও মোবাইল ফোন চুরির ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-সামগ্রী পাওয়া নিয়েও অভিযোগ করেছেন রোগীর স্বজনেরা। গত রোববার (১১ অক্টোবর) উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান মিন্টুর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে মণিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক ইসিজি করার পরামর্শ দেন। পরে ইসিজি যন্ত্রের প্রতিবেদন নিয়ে অসংগতির অভিযোগ তোলেন তাঁর ছেলে তোহা।

তাঁর অভিযোগ, যন্ত্রটি সঠিক প্রতিবেদন দিচ্ছিল না। তবে যন্ত্রটির কার্যকারিতা যাচাই এবং চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি পরীক্ষা ছাড়া এ অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

একই দিন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা এক রোগীর স্বজন মাসুদ পারভেজ অভিযোগ করেন, প্রয়োজনীয় স্যালাইন কিনে আনার পরও স্যালাইন দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত সামান্য সরঞ্জাম পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে হাসপাতালের স্টোরকিপার সাইফুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, স্টকের বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার (ইউএইচএফপিও) সঙ্গে কথা বলতে হবে।

মণিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শয্যার তুলনায় রোগীর চাপ বেশি এবং চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকট রয়েছে এমন বক্তব্য আগেও দিয়েছেন হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. ফাইয়াজ আহমেদ ফয়সাল।

হাসপাতালসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, আবহাওয়াজনিত অসুস্থতায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় সম্প্রতি ভর্তি রোগীর চাপও বেড়েছে। তবে জনবল ও শয্যাসংকট থাকলেও নির্ধারিত সময়ে চিকিৎসক উপস্থিতি, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-সামগ্রী ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই বলে মনে করছেন রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা।

হাসপাতালের বিভিন্ন অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগের বিষয়ে মণিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সম্রাট হোসেনকে অবহিত করা হলে তিনি বিষয়গুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করবেন বলে জানিয়েছেন।

রোগী ও তাঁদের স্বজনদের প্রত্যাশা, অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি বহির্বিভাগে চিকিৎসকদের সময়মতো উপস্থিতি নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা-সামগ্রীর সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হবে।

সরকারি হাসপাতাল সাধারণ মানুষের চিকিৎসার অন্যতম ভরসাস্থল। সেখানে সেবার মান নিয়ে একের পর এক অভিযোগ উঠলে তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমেই নিশ্চিত হতে পারে রোগীদের কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা।