মা ইলিশ রক্ষায় নিষেধাজ্ঞার সময় প্রথমবার সরকারি সহায়তা
- আপডেট সময় : ০২:৫৫:১৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
- / ২৫ বার পঠিত

মা ইলিশ সংরক্ষণে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময় অবশেষে সরকারি খাদ্যসহায়তার আওতায় এলেন খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার ৬৪৬ জন মৎস্যজীবী। দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের সহায়তার বাইরে থাকা জেলেদের জন্য এটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। নিষেধাজ্ঞার সময় মাছ ধরতে না পারায় আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া পরিবারগুলোর খাদ্যসংকট মোকাবিলায় এ উদ্যোগ স্বস্তি এনে দিয়েছে।
উপজেলা মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ডুমুরিয়ায় নিবন্ধিত মৎস্যজীবীর সংখ্যা ৫ হাজার ৪৯৮ জন। এর আগে সাগরে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময় ৬৬৫ জন জেলে সরকারি বিশেষ ভিজিএফের চাল পেতেন। তবে মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণ এবং সুন্দরবনে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময় ডুমুরিয়ার জেলেদের জন্য এ ধরনের খাদ্যসহায়তার সুযোগ ছিল না। ফলে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হলে অনেক পরিবারকে চরম আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে হতো।
বিশেষ করে সাগরের মোহনা ও সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা জেলেদের দুর্ভোগ ছিল বেশি। নিষেধাজ্ঞার সময় মাছ ধরার সুযোগ না থাকায় কেউ ভ্যান বা রিকশা চালিয়ে, আবার কেউ দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালাতেন। অনেকের পক্ষে পরিবারের সদস্যদের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়ত।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে ডুমুরিয়া উপজেলা মৎস্য বিভাগের উদ্যোগে বোট নিবন্ধন ও সাগরে মাছ ধরার অনুমতিপত্র সংগ্রহের কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আগে উপজেলার বোটগুলোর নিবন্ধন ও অনুমতিপত্র না থাকায় সরকারি নথিতে সেগুলোর যথাযথ তথ্য সংরক্ষিত ছিল না।
পরবর্তী সময়ে উপজেলা মৎস্য বিভাগের উদ্যোগে ২০২৫ সালে ৬৪টি বোটের অনুমতিপত্রের ব্যবস্থা করা হয়। প্রতিটি বোটে প্রায় ৮ থেকে ১৪ জন জেলে সাগরের মোহনা ও সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় মাছ ধরতে যান।
বোটের নিবন্ধন ও অনুমতিপত্রের মাধ্যমে জেলেদের সরকারি নথিভুক্তি এবং সহায়তার আওতায় আসার সুযোগ তৈরি হয়। এরই ধারাবাহিকতায় এবার মা ইলিশ সংরক্ষণকালীন বিশেষ ভিজিএফের চাল পাচ্ছেন উপজেলার ৬৪৬ জন মৎস্যজীবী। দীর্ঘদিনের বঞ্চনা কাটিয়ে সরকারি সহায়তা পাওয়ায় তাঁদের মধ্যে স্বস্তি ও আশাবাদ তৈরি হয়েছে।
জেলেরা জানান, নিষেধাজ্ঞার সময় মাছ ধরা বন্ধ থাকলেও সংসারের ব্যয় থেমে থাকে না। সন্তানদের পড়াশোনা, খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে হিমশিম খেতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি চাল তাঁদের পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে। তাঁরা এ উদ্যোগের জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্য আলী আসগর লবি এবং বর্তমান সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
একই সঙ্গে ডুমুরিয়া উপজেলা মৎস্য বিভাগের উদ্যোগ ও প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন তাঁরা। ডুমুরিয়া মৎস্য বিভাগ যেভাবে জেলেদের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে অতীতে তা দেখা যায়নি। অতীতের কোন সময়ে মৎস্য অফিস জেলেদের এই ভিজিএফের ব্যবস্থা করতে পারেনি। এসব কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন কয়েকজন মৎস্যজীবী।
জেলেদের ভাষ্য, মা ইলিশ ও জাটকা রক্ষার জন্য নির্ধারিত সময়ে মাছ ধরা বন্ধ রাখা জরুরি। এতে ইলিশের প্রজনন ও বংশবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয় এবং দেশের মৎস্যসম্পদ সংরক্ষিত থাকে। তবে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে হলে জেলেদের জীবন-জীবিকার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। এ জন্য খাদ্যসহায়তার পাশাপাশি বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির দাবি জানান তাঁরা।
মৎস্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, জেলেদের সরকারি সহায়তার আওতায় আনা হলে নিষেধাজ্ঞার সময় আইন মেনে চলার ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এতে একদিকে জেলেদের পরিবার সাময়িক আর্থিক চাপ থেকে কিছুটা মুক্তি পাবে, অন্যদিকে মা ইলিশ সংরক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবায়নও সহজ হবে।
ডুমুরিয়ার জেলেদের প্রত্যাশা, মা ইলিশ সংরক্ষণকালীন এই সহায়তা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি জাটকা সংরক্ষণ ও সুন্দরবনে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময়ও প্রকৃত জেলেদের জন্য সরকারি সহায়তার সুযোগ সম্প্রসারণ করা হবে। তাঁদের মতে, জেলেদের কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং মৎস্যসম্পদ রক্ষা, দুটি লক্ষ্যকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া গেলে দেশের মৎস্য খাত আরও সমৃদ্ধ হবে।
ডুমুরিয়া উপজেলার সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সোহেল মো: জিল্লুর রহমান রিগান বলেন, জেলেদের জীবন-জীবিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাগরে মাছ ধরার অনুমতিপত্র প্রদানের মাধ্যমে জেলেদের সরকারি নথিভুক্তির সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর ফলে মা ইলিশ সংরক্ষণকালীন বিশেষ ভিজিএফের আওতায় ৬৪৬ জন মৎস্যজীবীকে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
ডুমুরিয়ার জেলে পরিবারে আজ খুশির বন্যা বইছে। দীর্ঘদিন তারা এই ভিজিএফ থেকে বঞ্চিত ছিল। আমরা ডুমুরিয়ার মৎস্য চাষী ও মৎস্যজীবীদের কল্যাণে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ভবিষ্যতেও জেলেদের কল্যাণে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা এবং মৎস্যসম্পদ সংরক্ষশণে সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হবে।






















