পতিত জমিতে সোনালি স্বপ্ন, মাছ চাষে হালিমের ভাগ্য বদল
- আপডেট সময় : ০২:১৪:১১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ২৪ বার পঠিত

ভবদহের জলাবদ্ধতায় বছরের পর বছর ফসল ফলানো যেত না। বিস্তীর্ণ জমি পড়ে থাকত পানির নিচে। জমির মালিকদের কাছে এসব জমি একসময় হয়ে উঠেছিল বোঝা। সেই পতিত জমিকেই সম্ভাবনার ক্ষেত্র বানিয়েছেন যশোরের মণিরামপুরের সমাজসেবক ও ব্যবসায়ী এম এ হালিম।
জলাবদ্ধ জমি লিজ নিয়ে মাছের ঘের তৈরি করে তিনি যেমন নিজের ভাগ্য বদলেছেন, তেমনি জমির মালিকদের জন্যও সৃষ্টি করেছেন নিয়মিত আয়ের পথ। ২০০৭ সালে শুরু করা তাঁর এই উদ্যোগ প্রায় দুই দশক ধরে জলাবদ্ধতাকবলিত এলাকায় কর্মসংস্থান ও স্বনির্ভরতার দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
মণিরামপুরের ভবদহ তীরবর্তী মানুষের কাছে জলাবদ্ধতা দীর্ঘদিনের অভিশাপ। ১৯৯০-এর দশক থেকে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে বিল কপালিয়া, বিল খুকশিয়া, বিল আড়পাতা, বিল কেদারিয়াসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকার জমিতে নিয়মিত ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয়ে আসছে। বছরের পর বছর জমি পানিতে তলিয়ে থাকায় কৃষিনির্ভর বহু পরিবার পড়েছিল চরম অনিশ্চয়তায়।
এমন বাস্তবতায় জলাবদ্ধ জমির বিকল্প ব্যবহারের পথ খুঁজে বের করার উদ্যোগ নেন এম এ হালিম। ২০০৭ সালের শুরুর দিকে ভবদহ তীরবর্তী খানপুর ও কুলটিয়া ইউনিয়নের বিল শালিকার পতিত জমির মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি। তাঁর প্রস্তাব ছিল, যেসব জমিতে জলাবদ্ধতার কারণে ফসল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না, সেসব জমি লিজ নিয়ে সেখানে মাছ চাষ করা হবে।
জমির মালিকদের সম্মতিতে নির্দিষ্ট হারে লিজ নিয়ে ডিট তৈরি করে শুরু করেন বাণিজ্যিক মৎস্য চাষ। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। দীর্ঘদিনের মৎস্য চাষে নিজে যেমন সফল হয়েছেন, তেমনি তাঁর নেওয়া লিজের কারণে উপকৃত হয়েছেন জমির মালিকরাও।
যে জমি থেকে ফসল পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন মালিকরা, সেই জমি থেকেই এখন নিয়মিত লিজের টাকা পাচ্ছেন তাঁরা। ফলে একসময়কার পতিত জমি এখন অনেক পরিবারের জীবন-জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে মাছের ঘেরকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে স্থানীয় কর্মসংস্থানের সুযোগ।
স্থানীয় বাসিন্দা ও শিক্ষক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ভবদহের স্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে পতিত জমিকে লিজ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মৎস্য খামারে পরিণত করার ক্ষেত্রে এম এ হালিমের উদ্যোগ স্থানীয়ভাবে আলাদা দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। একসময় যে জমি ছিল ফসলহীন, যে জল ছিল মানুষের দুর্ভোগের প্রতীক, সেই জমি ও জলকেই কাজে লাগিয়ে পরিবর্তনের গল্প লিখেছেন তিনি।
জমির মালিক আবুল কালাম আজাদ বলেন, জলাবদ্ধতার কারণে দীর্ঘদিন তাঁদের জমিতে ফসল ফলানো সম্ভব হয়নি। এম এ হালিম জমি লিজ নেওয়ার পর সেই জমি থেকে নিয়মিত আয় পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, যে জমি একসময় কোনো কাজে আসত না, সেই জমিই এখন পরিবারের খরচ চালানোর অন্যতম ভরসা।
এম এ হালিম বলেন, জলাবদ্ধতার কারণে বছরের পর বছর জমি পড়ে থাকলে কৃষকের যেমন ক্ষতি, দেশেরও তেমনি ক্ষতি। তাই পতিত জমিকে মৎস্য চাষের আওতায় এনে কর্মসংস্থান ও আয় বাড়ানোর চেষ্টা করেছি। এই উদ্যোগের মাধ্যমে নিজের পাশাপাশি জমির মালিকরাও উপকৃত হচ্ছেন, এটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
খানপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, এম এ হালিমের উদ্যোগের সবচেয়ে বড় দিক হলো—তিনি জলাবদ্ধতার কারণে অনুৎপাদনশীল হয়ে পড়া জমিকে বোঝা হিসেবে না দেখে সম্ভাবনার জায়গা হিসেবে দেখেছেন। তাঁর লিজ নেওয়া জমিতে মাছ চাষের ফলে একদিকে জমির মালিকরা আয় পাচ্ছেন, অন্যদিকে মৎস্য খামারকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি এম এ হালিমের মৎস্য খামার পরিদর্শন করেন উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সেলিম রেজা। তিনি উদ্যোগটির প্রশংসা করে বলেন, জলাবদ্ধ এলাকার অনাবাদি জমিকে পরিকল্পিতভাবে মৎস্য চাষে ব্যবহার করা গেলে তা স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মণিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সম্রাট হোসেন বলেন, মণিরামপুরের মৎস্য সম্পদ অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। আত্মকর্মসংস্থান ও স্বনির্ভরতা সৃষ্টিতে মাছ চাষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সরকারের নানা উদ্যোগে এ খাতকে আরও এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
ভবদহের জলাবদ্ধতা এখনও মানুষের জন্য বড় সংকট। তবে সেই সংকটের মধ্যেই সম্ভাবনা খুঁজে নেওয়ার উদাহরণ তৈরি করেছেন এম এ হালিম। তাঁর উদ্যোগ দেখিয়েছে, সব সংকটের সমাধান শুধু সংকট দূর হওয়ার অপেক্ষায় নয়; কখনো কখনো প্রতিকূলতার মধ্যেই সম্ভাবনার পথ খুঁজে নেওয়ার সাহস মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে।



















