সাতক্ষীরায় বিপু রেজার মৃত্যুর ঘটনায় নতুন মোড়
রাসেল রেজা ও স্ত্রী অলিমার বিরুদ্ধে মিথ্যা সংবাদ প্রকাশের অভিযোগ
- আপডেট সময় : ০৩:৫২:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ১৩১ বার পঠিত

সাতক্ষীরার আশাশুনিতে বিপু রেজার রহস্যজনক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দায়ের করা হত্যা মামলাকে ঘিরে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এবার বিপু রেজার মা রেহানা পারভীনের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তাঁর ছেলে রাসেল রেজা ও পুত্রবধূ অলিমা ইয়াসমিনের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়েছেন তিনি।
রেহানা পারভীনের দাবি, তাঁকে চাপ প্রয়োগ করে ছেলে ও পুত্রবধূর বিরুদ্ধে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বক্তব্য দিতে বাধ্য করা হয়েছে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নাছিমা খাতুন।
রেহানা পারভীন সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার উত্তর গোঁদাড়া গ্রামের বাসিন্দা এবং আব্দুর রশিদ সরদারের স্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, গত ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে বিভিন্ন প্রিন্ট ও অনলাইন গণমাধ্যমে তাঁর বক্তব্য হিসেবে যে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, তা প্রকৃত ঘটনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাঁর দাবি, বিপু রেজার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দায়ের করা হত্যা মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিরোধের জেরে তাঁকে দিয়ে রাসেল রেজা ও অলিমা ইয়াসমিনের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়ানো হয়েছে।
২০ হাজার টাকার বিনিময়ে বক্তব্য নেওয়ার অভিযোগ: রেহানা পারভীনের অভিযোগ, তাঁর সাবেক পুত্রবধূ নাছিমা খাতুন ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে সাংবাদিক জাহিদ হোসাইনকে সঙ্গে নিয়ে তাঁর ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। এ সময় রাসেল রেজা ও অলিমা ইয়াসমিনের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও মনগড়া বক্তব্য নেওয়া হয় বলে তিনি দাবি করেন।
পরবর্তী সময়ে ওই বক্তব্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন প্রিন্ট ও অনলাইন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ করা হয়। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক পেজেও তা প্রচার করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ জানিয়ে গত ২৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের কাছে দেওয়া এক বিবৃতিতে রেহানা পারভীন বলেন, তাঁর ছেলে রাসেল রেজা ও পুত্রবধূ অলিমা ইয়াসমিনকে জড়িয়ে প্রকাশিত অভিযোগ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তাঁর বক্তব্য যথাযথভাবে উপস্থাপন না করে ভিন্নভাবে সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রকৃত ঘটনা অনুসন্ধানের মাধ্যমে সত্য তুলে ধরতে সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
বিপু রেজার মৃত্যু ঘিরে হত্যা মামলা
রেহানা পারভীনের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর ছোট ছেলে বিপু রেজার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে পরিবারে শোক ও মানসিক অস্থিরতা বিরাজ করছে। ছেলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের বিচারের দাবিতে তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ জুলাই বিপু রেজার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় তাঁর বাবা আব্দুর রশিদ সরদার সাতক্ষীরা সদর আমলি আদালতে চারজনকে আসামি করে মামলা করেন। মামলায় বিপু রেজার স্ত্রী নাছিমা খাতুন, নাছিমার বর্তমান স্বামী হিসেবে উল্লেখিত গোলাম মোস্তফা এবং নাছিমার বাবা-মাকে আসামি করা হয়েছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
মামলাটির নম্বর ১৫৯০/২৫। পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এতে দণ্ডবিধির ৩০৬, ৩০২, ৪৯৭, ৪০৩, ৪০৬, ৪২০, ১০৯ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
রেহানা পারভীনের দাবি, তাঁর ছেলে বিপু রেজার মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল না। তাঁকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে বলে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও এ ঘটনায় কারও দায় রয়েছে কি না, তা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
রাসেল রেজা ও অলিমার বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে পাল্টা বক্তব্য: সম্প্রতি রেহানা পারভীনের নামে প্রকাশিত একটি সংবাদে অভিযোগ করা হয়, পৈতৃক সম্পত্তি পুত্রবধূর নামে লিখে দেওয়ার পর তাঁকে মারধর, গলায় ওড়না পেঁচিয়ে হত্যাচেষ্টা, নগদ টাকা ও স্বর্ণের চেইন নিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।
ওই সংবাদে ছেলে রাসেল রেজা ও তাঁর স্ত্রী অলিমা ইয়াসমিনের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ তুলে আদালতে মামলা করার কথাও উল্লেখ করা হয়। তবে রেহানা পারভীনের বর্তমান বক্তব্য অনুযায়ী, প্রকাশিত সংবাদে তাঁর বক্তব্য যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয়নি।
তিনি দাবি করেন, হত্যা মামলাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধের জের ধরে তাঁকে দিয়ে ছেলে ও পুত্রবধূর বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়ানো হয়েছে। এদিকে, রাসেল রেজা ও অলিমা ইয়াসমিনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট মামলার নথি, চিকিৎসা প্রতিবেদন, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
কনস্টেবল গোলাম মোস্তফার প্রথম স্ত্রীর অভিযোগ: এ ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে সাতক্ষীরা পুলিশ লাইন্সে কর্মরত কনস্টেবল গোলাম মোস্তফার প্রথম স্ত্রী কানিজ ফাতেমা ঐশীর একটি লিখিত অভিযোগ।
সাতক্ষীরার পুলিশ সুপার বরাবর দেওয়া ওই অভিযোগে কানিজ ফাতেমা ঐশী দাবি করেন, তাঁর স্বামী গোলাম মোস্তফার সঙ্গে নাছিমা খাতুনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এ নিয়ে প্রতিবাদ করায় তিনি শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন।
অভিযোগে তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিপু রেজার মৃত্যুর পর নাছিমা খাতুনকে ঘিরে পারিবারিক বিরোধের সৃষ্টি হয়। এ ঘটনায় যথাযথ বিচার চেয়ে তিনি পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত আবেদন করেছিলেন বলে দাবি করেন।
তবে কানিজ ফাতেমা ঐশীর এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের ফলাফল পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে নাছিমা খাতুনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিককে বলেন, তিনি কাউকে কোনো টাকা দেননি এবং রেহানা পারভীনের ওপর কোনো ধরনের চাপ সৃষ্টি করেননি।
বিপু রেজার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এবং গোলাম মোস্তফার সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে বক্তব্য দিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন। পরে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
এ বিষয়ে কনস্টেবল গোলাম মোস্তফার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে নাছিমা খাতুনের সঙ্গে তাঁর বিয়ের আগে, বিপু রেজা জীবিত থাকাকালে কোনো পরকীয়া সম্পর্ক ছিল কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বক্তব্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে, গোলাম মোস্তফার প্রথম স্ত্রী কানিজ ফাতেমা ঐশীর দাবি, তাঁর স্বামীর সঙ্গে বিপু রেজার স্ত্রী নাছিমা খাতুনের দীর্ঘদিন ধরে পরকীয়া সম্পর্ক ছিল।
বিপু রেজার মৃত্যুর সঙ্গে কথিত ওই সম্পর্কের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের সরাসরি জবাব না দিয়ে গোলাম মোস্তফা সরাসরি দেখা করে বক্তব্য দেওয়ার কথা জানান।
বিপু রেজার মৃত্যু, এ ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলা এবং এর জেরে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সৃষ্ট বিরোধ নিয়ে এলাকায় নানা আলোচনা চলছে।
রেহানা পারভীন ও তাঁর পরিবারের দাবি, বিপু রেজার মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে রাসেল রেজা ও অলিমা ইয়াসমিনের বিরুদ্ধে প্রকাশিত অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
অন্যদিকে, রাসেল রেজা ও অলিমা ইয়াসমিনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত নির্যাতনের অভিযোগ, রেহানা পারভীনের প্রতিবাদ এবং বিপু রেজার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দায়ের করা মামলার বিষয়গুলো নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য, মামলার নথি, প্রমাণাদি ও তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতেই প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
























