ঢাকা ০৩:৫৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মৃত্যু হলো ‘হুন্ডি কাজল’-এর, শেষ হলো আলোচিত এক অধ্যায়

দর্পণ ডেক্স
  • আপডেট সময় : ০৯:৫৩:৫৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬
  • / ৪৫ বার পঠিত

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত আর্থিক কেলেঙ্কারির মূল হোতা, ‘হুন্ডি কাজল’ নামে পরিচিত ফারুক আহমেদ কাজল মারা গেছেন। বুধবার (২৪ জুন) রাত ৮টার দিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার চাকদহ থানা শহরের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল প্রায় ৭৫ বছর। দীর্ঘদিন ধরে তিনি কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে। বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) ভারতের স্থানীয় একটি কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তার ছোট ভাই ও কোটচাঁদপুর শহরের বাসিন্দা কবি চঞ্চল শাহরিয়ার।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আশির দশকে ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে একজন প্রতিভাবান ফুটবলার হিসেবে পরিচিত ছিলেন ফারুক আহমেদ কাজল। পরবর্তীতে ১৯৯৫ সালের দিকে তিনি অবৈধ হুন্ডি ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। অস্বাভাবিক মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে গড়ে তোলেন বিশাল অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক, যেখানে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার মানুষ বিনিয়োগ করেন।

ঝিনাইদহ, যশোর, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুরসহ বিভিন্ন এলাকার কৃষক, চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ নিজেদের সঞ্চয়, এমনকি জমিজমা বিক্রি করে তার প্রতিষ্ঠানে অর্থ লগ্নি করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অধিকাংশ বিনিয়োগকারী তাদের অর্থ ফেরত না পেয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েন।

স্থানীয়দের দাবি, ১৯৯৬-৯৭ সালের দিকে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার অর্থ নিয়ে কাজল আত্মগোপনে চলে যান। তার এ কেলেঙ্কারির ফলে হাজারো পরিবার আর্থিকভাবে ধ্বংস হয়ে যায়। অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন, কেউ কেউ আত্মহত্যার পথও বেছে নেন। অর্থ ফেরত পাওয়াকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনাও ঘটে।

ঘটনার পর তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের অর্থ উদ্ধারের আশ্বাস দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।

হুন্ডি কেলেঙ্কারির ঘটনায় কাজলের বিরুদ্ধে কোটচাঁদপুরসহ বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা দায়ের হয়। একপর্যায়ে তিনি গ্রেপ্তার হলেও পরে জামিনে মুক্ত হয়ে গোপনে ভারতে চলে যান। সেখানে দ্বিতীয় বিয়ে করে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন বলে জানা গেছে।

কাজলের ছোট ভাই চঞ্চল শাহরিয়ার বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে আমাদের পরিবারের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ ছিল না। তবে ভারতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়েছে, এ তথ্য সত্য।”

এদিকে, মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তার প্রথম স্ত্রী শামিমা বেগমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তিনি বর্তমানে কোটচাঁদপুরের সলেমান গ্রামে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে।

কোটচাঁদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনসারুল ইসলাম জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে তিনি কাজলের মৃত্যুর খবর জেনেছেন। তার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন আদালতে একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে এবং বর্তমানে তার নামে পাঁচটি গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যকর ছিল।

হুন্ডি কাজলের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত আর্থিক কেলেঙ্কারির একটি অধ্যায়ের অবসান ঘটল। তবে তার প্রতারণার শিকার হয়ে সর্বস্ব হারানো হাজারো মানুষের বেদনা ও দীর্ঘশ্বাস আজও রয়ে গেছে স্মৃতির গভীরে।

মৃত্যু হলো ‘হুন্ডি কাজল’-এর, শেষ হলো আলোচিত এক অধ্যায়

আপডেট সময় : ০৯:৫৩:৫৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত আর্থিক কেলেঙ্কারির মূল হোতা, ‘হুন্ডি কাজল’ নামে পরিচিত ফারুক আহমেদ কাজল মারা গেছেন। বুধবার (২৪ জুন) রাত ৮টার দিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার চাকদহ থানা শহরের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল প্রায় ৭৫ বছর। দীর্ঘদিন ধরে তিনি কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে। বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) ভারতের স্থানীয় একটি কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তার ছোট ভাই ও কোটচাঁদপুর শহরের বাসিন্দা কবি চঞ্চল শাহরিয়ার।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আশির দশকে ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে একজন প্রতিভাবান ফুটবলার হিসেবে পরিচিত ছিলেন ফারুক আহমেদ কাজল। পরবর্তীতে ১৯৯৫ সালের দিকে তিনি অবৈধ হুন্ডি ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। অস্বাভাবিক মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে গড়ে তোলেন বিশাল অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক, যেখানে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার মানুষ বিনিয়োগ করেন।

ঝিনাইদহ, যশোর, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুরসহ বিভিন্ন এলাকার কৃষক, চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ নিজেদের সঞ্চয়, এমনকি জমিজমা বিক্রি করে তার প্রতিষ্ঠানে অর্থ লগ্নি করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অধিকাংশ বিনিয়োগকারী তাদের অর্থ ফেরত না পেয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েন।

স্থানীয়দের দাবি, ১৯৯৬-৯৭ সালের দিকে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার অর্থ নিয়ে কাজল আত্মগোপনে চলে যান। তার এ কেলেঙ্কারির ফলে হাজারো পরিবার আর্থিকভাবে ধ্বংস হয়ে যায়। অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন, কেউ কেউ আত্মহত্যার পথও বেছে নেন। অর্থ ফেরত পাওয়াকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনাও ঘটে।

ঘটনার পর তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের অর্থ উদ্ধারের আশ্বাস দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।

হুন্ডি কেলেঙ্কারির ঘটনায় কাজলের বিরুদ্ধে কোটচাঁদপুরসহ বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা দায়ের হয়। একপর্যায়ে তিনি গ্রেপ্তার হলেও পরে জামিনে মুক্ত হয়ে গোপনে ভারতে চলে যান। সেখানে দ্বিতীয় বিয়ে করে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন বলে জানা গেছে।

কাজলের ছোট ভাই চঞ্চল শাহরিয়ার বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে আমাদের পরিবারের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ ছিল না। তবে ভারতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়েছে, এ তথ্য সত্য।”

এদিকে, মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তার প্রথম স্ত্রী শামিমা বেগমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তিনি বর্তমানে কোটচাঁদপুরের সলেমান গ্রামে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে।

কোটচাঁদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনসারুল ইসলাম জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে তিনি কাজলের মৃত্যুর খবর জেনেছেন। তার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন আদালতে একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে এবং বর্তমানে তার নামে পাঁচটি গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যকর ছিল।

হুন্ডি কাজলের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত আর্থিক কেলেঙ্কারির একটি অধ্যায়ের অবসান ঘটল। তবে তার প্রতারণার শিকার হয়ে সর্বস্ব হারানো হাজারো মানুষের বেদনা ও দীর্ঘশ্বাস আজও রয়ে গেছে স্মৃতির গভীরে।