ঢাকা ০৯:৩১ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ডুমুরিয়ায় কাঁকড়া চাষে বদলাচ্ছে হাজারো চাষীর জীবন

শেখ মাহতাব হোসেন, ডুমুরিয়া
  • আপডেট সময় : ০৮:০০:৪৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
  • / ৪৭ বার পঠিত

ধান কিংবা প্রথাগত মাছ চাষের তুলনায় কম সময়ে অধিক লাভজনক হওয়ায় খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলায় দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে কাঁকড়া চাষ। অনুকূল আবহাওয়া, লবণাক্ত পানির সহজলভ্যতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক চাহিদার কারণে এ উপজেলার শত শত বেকার যুবক ও সাধারণ চাষী কাঁকড়া চাষে যুক্ত হয়ে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন।

ডুমুরিয়ার বিভিন্ন ইউনিয়নের বিল ও ঘেরে এখন বাণিজ্যিকভাবে উন্নত জাতের কাঁকড়া উৎপাদন হচ্ছে। স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি এসব কাঁকড়া বিদেশেও রফতানি হচ্ছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

স্থানীয় চাষীরা জানান, অন্যান্য মাছের তুলনায় কাঁকড়ার রোগবালাই কম এবং মাত্র তিন থেকে চার মাসের মধ্যেই এটি বিক্রির উপযোগী হয়ে ওঠে। বর্তমানে ‘সফট শেল’ (নরম খোলস) ও ‘হার্ড শেল’ (শক্ত খোলস) উভয় পদ্ধতিতেই কাঁকড়া মোটাতাজাকরণ করা হচ্ছে। বিশেষ করে ডিমযুক্ত স্ত্রী কাঁকড়া এবং গ্রেড-ওয়ান পুরুষ কাঁকড়ার বাজারমূল্য তুলনামূলক অনেক বেশি।

ডুমুরিয়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সোহেল মো. জিল্লুর রহমান রিগান বলেন, “ডুমুরিয়ার মাটি ও পানি কাঁকড়া চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এখানকার চাষীরা প্রথাগত চাষাবাদ থেকে বেরিয়ে আধুনিক পদ্ধতিতে কাঁকড়া মোটাতাজাকরণ করছেন। মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ, মানসম্মত পোনা নির্বাচন এবং ঘের ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সহযোগিতা করা হচ্ছে। ঝুঁকি কম ও লাভ বেশি হওয়ায় প্রতিনিয়ত নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে।”

খুলনার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. বদরুজ্জামান বলেন, “খুলনা অঞ্চলের কাঁকড়ার গুণগত মান আন্তর্জাতিক বাজারে অত্যন্ত সমাদৃত। বিশেষ করে চীন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, হংকং, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কাঁকড়া দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রফতানি খাত হিসেবে গড়ে উঠছে। চাষীরা যাতে ন্যায্যমূল্য পান এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমে, সেজন্য বাজার সংযোগ তৈরিতে কাজ করছে মৎস্য বিভাগ। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব কাঁকড়া চাষ সম্প্রসারণেও বিভিন্ন সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”

মাদারতলা, মাগুরখালী, সাহস ও শোভনা ইউনিয়নের একাধিক চাষীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একসময় যারা ঋণের বোঝায় জর্জরিত ছিলেন, তারা এখন কাঁকড়া চাষের মাধ্যমে আর্থিকভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। অনেকেই পাকা বাড়ি নির্মাণ করেছেন, জমি কিনেছেন এবং পরিবারের জীবনমানের উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটিয়েছেন।

চাষীরা জানান, নদী-নালা থেকে সংগ্রহ করা ছোট কাঁকড়া ঘেরে এনে ৩০ থেকে ৮০ দিন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরিচর্যা ও খাদ্য সরবরাহের মাধ্যমে মোটাতাজা করা হয়। এরপর আকার ও মান অনুযায়ী দেশীয় বাজার এবং বিদেশে রফতানি করা হয়।

তবে এ শিল্পের আরও বিকাশে সহজ শর্তে ঋণ প্রদান, মানসম্মত পোনা উৎপাদনের জন্য হ্যাচারি স্থাপন এবং রফতানি ব্যবস্থার উন্নয়নের দাবি জানিয়েছেন চাষীরা। তাদের মতে, প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা নিশ্চিত হলে ডুমুরিয়ার কাঁকড়া চাষ দেশের রফতানি আয়ে চিংড়ি শিল্পের মতোই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।

ট্যাগস :

ডুমুরিয়ায় কাঁকড়া চাষে বদলাচ্ছে হাজারো চাষীর জীবন

আপডেট সময় : ০৮:০০:৪৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬

ধান কিংবা প্রথাগত মাছ চাষের তুলনায় কম সময়ে অধিক লাভজনক হওয়ায় খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলায় দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে কাঁকড়া চাষ। অনুকূল আবহাওয়া, লবণাক্ত পানির সহজলভ্যতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক চাহিদার কারণে এ উপজেলার শত শত বেকার যুবক ও সাধারণ চাষী কাঁকড়া চাষে যুক্ত হয়ে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন।

ডুমুরিয়ার বিভিন্ন ইউনিয়নের বিল ও ঘেরে এখন বাণিজ্যিকভাবে উন্নত জাতের কাঁকড়া উৎপাদন হচ্ছে। স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি এসব কাঁকড়া বিদেশেও রফতানি হচ্ছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

স্থানীয় চাষীরা জানান, অন্যান্য মাছের তুলনায় কাঁকড়ার রোগবালাই কম এবং মাত্র তিন থেকে চার মাসের মধ্যেই এটি বিক্রির উপযোগী হয়ে ওঠে। বর্তমানে ‘সফট শেল’ (নরম খোলস) ও ‘হার্ড শেল’ (শক্ত খোলস) উভয় পদ্ধতিতেই কাঁকড়া মোটাতাজাকরণ করা হচ্ছে। বিশেষ করে ডিমযুক্ত স্ত্রী কাঁকড়া এবং গ্রেড-ওয়ান পুরুষ কাঁকড়ার বাজারমূল্য তুলনামূলক অনেক বেশি।

ডুমুরিয়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সোহেল মো. জিল্লুর রহমান রিগান বলেন, “ডুমুরিয়ার মাটি ও পানি কাঁকড়া চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এখানকার চাষীরা প্রথাগত চাষাবাদ থেকে বেরিয়ে আধুনিক পদ্ধতিতে কাঁকড়া মোটাতাজাকরণ করছেন। মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ, মানসম্মত পোনা নির্বাচন এবং ঘের ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সহযোগিতা করা হচ্ছে। ঝুঁকি কম ও লাভ বেশি হওয়ায় প্রতিনিয়ত নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে।”

খুলনার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. বদরুজ্জামান বলেন, “খুলনা অঞ্চলের কাঁকড়ার গুণগত মান আন্তর্জাতিক বাজারে অত্যন্ত সমাদৃত। বিশেষ করে চীন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, হংকং, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কাঁকড়া দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রফতানি খাত হিসেবে গড়ে উঠছে। চাষীরা যাতে ন্যায্যমূল্য পান এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমে, সেজন্য বাজার সংযোগ তৈরিতে কাজ করছে মৎস্য বিভাগ। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব কাঁকড়া চাষ সম্প্রসারণেও বিভিন্ন সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”

মাদারতলা, মাগুরখালী, সাহস ও শোভনা ইউনিয়নের একাধিক চাষীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একসময় যারা ঋণের বোঝায় জর্জরিত ছিলেন, তারা এখন কাঁকড়া চাষের মাধ্যমে আর্থিকভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। অনেকেই পাকা বাড়ি নির্মাণ করেছেন, জমি কিনেছেন এবং পরিবারের জীবনমানের উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটিয়েছেন।

চাষীরা জানান, নদী-নালা থেকে সংগ্রহ করা ছোট কাঁকড়া ঘেরে এনে ৩০ থেকে ৮০ দিন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরিচর্যা ও খাদ্য সরবরাহের মাধ্যমে মোটাতাজা করা হয়। এরপর আকার ও মান অনুযায়ী দেশীয় বাজার এবং বিদেশে রফতানি করা হয়।

তবে এ শিল্পের আরও বিকাশে সহজ শর্তে ঋণ প্রদান, মানসম্মত পোনা উৎপাদনের জন্য হ্যাচারি স্থাপন এবং রফতানি ব্যবস্থার উন্নয়নের দাবি জানিয়েছেন চাষীরা। তাদের মতে, প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা নিশ্চিত হলে ডুমুরিয়ার কাঁকড়া চাষ দেশের রফতানি আয়ে চিংড়ি শিল্পের মতোই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।