ঢাকা ০৮:৩৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬, ১৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মাদারীপুরের নিখোঁজ স্কুলছাত্রী নড়াইলে, ভারতে পাচারের পাঁয়তারা

রিপন বিশ্বাস, নড়াইল
  • আপডেট সময় : ০৭:৫১:৫৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬
  • / ২৫ বার পঠিত

মাদারীপুরের রাজৈর থেকে নিখোঁজ দশম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীকে নড়াইলে এনে ভুয়া পরিচয়ে নথিপত্র তৈরি করে ভারতে পাচারের পাঁয়তারা করা হচ্ছে—এমন অভিযোগের তথ্য-প্রমাণ পেয়েছেন সাংবাদিকেরা।

নিখোঁজ ওই কিশোরীর নাম সমাপ্তী বাড়ৈ (১৪)। সে রাজৈর উপজেলার চৌরাসী গ্রামের কালু বাড়ৈ ও ববিতা বাড়ৈর মেয়ে। পরিবারের দাবি, প্রায় তিন মাস ধরে নিখোঁজ রয়েছে সমাপ্তী। এ ঘটনায় রাজৈর থানায় লিখিত অভিযোগও করেছেন তার বাবা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফেসবুকে যোগাযোগের সূত্র ধরে ভারত থেকে আসা বাপ্পি রায় ওরফে আবির নামের এক যুবক সমাপ্তীকে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে নড়াইলে নিয়ে আসেন বলে অভিযোগ। পরে তাকে শেখহাটি ইউনিয়নের দেবভোগ গ্রামের সুব্রত রায়ের বাড়িতে রাখা হয় বলে জানা গেছে।

এরপর সমাপ্তীর পরিচয় বদলের প্রক্রিয়া শুরু হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। তার নামের জায়গায় ‘রুপসী রায়’ ব্যবহার করে নথিপত্র তৈরির তথ্য পাওয়া গেছে। বাবা-মায়ের পরিচয়েও পরিবর্তন আনা হয় বলে অভিযোগ।

অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, দেবভোগ গ্রামের প্রসেন রায় ও বিথীকা রাণী রায়ের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে সমাপ্তীর নামে জন্মনিবন্ধন তৈরির চেষ্টা করা হয়। এ কাজে স্থানীয় কয়েকজনের পাশাপাশি একটি কম্পিউটার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও পাসপোর্ট অফিসের দালালচক্রের সম্পৃক্ততার অভিযোগও পাওয়া গেছে।

নড়াইল শহরের ইউনাইটেড কম্পিউটারের স্বত্বাধিকারী কৌশিক দাস রায় এ প্রক্রিয়ার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। তার দাবি, তার এক আত্মীয় শিক্ষিকা মিঠু রাণী ভদ্রও জন্মনিবন্ধন তৈরির প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবগত ছিলেন।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে জন্মনিবন্ধন তৈরির প্রক্রিয়া নিয়ে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, সমাপ্তীর স্থায়ী ঠিকানা শেখহাটি ইউনিয়নে হলেও তার নামে ডিজিটাল জন্মনিবন্ধন করা হয়েছে বাওইসোনা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে।

এ ঘটনায় বাওইসোনা ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোক্তা নাঈম হোসেন ও সচিব মান্নানের বিরুদ্ধে যোগসাজশের অভিযোগ উঠেছে। তাদের সহযোগিতায় জাল তথ্য ব্যবহার করে জন্মনিবন্ধন তৈরি করা হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

অভিযোগ রয়েছে, ওই নথিপত্রের ভিত্তিতে পরবর্তীতে সমাপ্তীকে ‘রুপসী রায়’ পরিচয়ে পাসপোর্টও তৈরি করা হয়েছে। এমনকি পাসপোর্টটি মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যদের হাতে পৌঁছে গেছে বলেও অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া গেছে।

এদিকে সমাপ্তীর পরিবার বলছে, মেয়েকে উদ্ধারে তারা দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করছে। খোঁজ না পেয়ে তার বাবা কালু বাড়ৈ রাজৈর থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে মেয়েকে অপহরণ করে মানবপাচারকারী চক্রের হাতে জিম্মি রাখার আশঙ্কার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

সমাপ্তীর বড় বোনের জামাই বলেন, ফেসবুকে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে ভারত থেকে আসা আবির নড়াইলের কয়েকজনের সহযোগিতায় সমাপ্তীকে নিয়ে গেছে বলে তারা জানতে পেরেছেন। তাকে ভারতে পাচারের চেষ্টা চলছে বলেও তাদের আশঙ্কা। মেয়েটিকে উদ্ধারে পুলিশ ও সাংবাদিকদের সহযোগিতা চান তারা।

রাজৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ আমিনুল ইসলাম অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। দ্রুত মানবপাচারকারী চক্রের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই সজিব বলেন, তিনি সমাপ্তীর বাড়িতে গিয়ে ঘটনার সত্যতা যাচাই করেছেন। তবে ভুক্তভোগী অন্য জেলায় থাকায় এবং তার সুনির্দিষ্ট অবস্থান নিশ্চিত না হওয়ায় তদন্তে কিছুটা সময় লাগছে। দ্রুত অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনা হবে।

নড়াইলের সাংবাদিক ও রুর‍্যাল জার্নালিস্ট ফাউন্ডেশনের (আরজেএফ) সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মো. সাজ্জাদ আলম খান সজল বলেন, একটি সাংবাদিক দল দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি অনুসন্ধান করছে। তাদের হাতে সমাপ্তীর পরিচয় পরিবর্তন, নথিপত্র তৈরি ও পাসপোর্ট করার বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ এসেছে বলে দাবি করেন তিনি।

তার ভাষ্য, ১৪ বছরের একটি কিশোরীর পরিচয় বদলে অন্য জেলার ঠিকানায় জন্মনিবন্ধন ও পাসপোর্ট তৈরি করা সাধারণ প্রক্রিয়ায় সম্ভব নয়। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা তদন্ত করে বের করা জরুরি।

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা কি না, নাকি নড়াইলে সক্রিয় একটি বড় মানবপাচার চক্রের অংশ—তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরকারি নথি তৈরির সঙ্গে জড়িতদের ভূমিকা যাচাই এবং নিখোঁজ কিশোরীকে দ্রুত উদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন তারা।

তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে অভিযুক্ত বাওইসোনা ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোক্তা নাঈম হোসেন, সচিব মান্নান, মিঠু রাণী ভদ্র, সুব্রত রায় ও বাপ্পি রায় ওরফে আবিরের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে তা যুক্ত করা হবে।

ট্যাগস :

মাদারীপুরের নিখোঁজ স্কুলছাত্রী নড়াইলে, ভারতে পাচারের পাঁয়তারা

আপডেট সময় : ০৭:৫১:৫৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬

মাদারীপুরের রাজৈর থেকে নিখোঁজ দশম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীকে নড়াইলে এনে ভুয়া পরিচয়ে নথিপত্র তৈরি করে ভারতে পাচারের পাঁয়তারা করা হচ্ছে—এমন অভিযোগের তথ্য-প্রমাণ পেয়েছেন সাংবাদিকেরা।

নিখোঁজ ওই কিশোরীর নাম সমাপ্তী বাড়ৈ (১৪)। সে রাজৈর উপজেলার চৌরাসী গ্রামের কালু বাড়ৈ ও ববিতা বাড়ৈর মেয়ে। পরিবারের দাবি, প্রায় তিন মাস ধরে নিখোঁজ রয়েছে সমাপ্তী। এ ঘটনায় রাজৈর থানায় লিখিত অভিযোগও করেছেন তার বাবা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফেসবুকে যোগাযোগের সূত্র ধরে ভারত থেকে আসা বাপ্পি রায় ওরফে আবির নামের এক যুবক সমাপ্তীকে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে নড়াইলে নিয়ে আসেন বলে অভিযোগ। পরে তাকে শেখহাটি ইউনিয়নের দেবভোগ গ্রামের সুব্রত রায়ের বাড়িতে রাখা হয় বলে জানা গেছে।

এরপর সমাপ্তীর পরিচয় বদলের প্রক্রিয়া শুরু হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। তার নামের জায়গায় ‘রুপসী রায়’ ব্যবহার করে নথিপত্র তৈরির তথ্য পাওয়া গেছে। বাবা-মায়ের পরিচয়েও পরিবর্তন আনা হয় বলে অভিযোগ।

অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, দেবভোগ গ্রামের প্রসেন রায় ও বিথীকা রাণী রায়ের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে সমাপ্তীর নামে জন্মনিবন্ধন তৈরির চেষ্টা করা হয়। এ কাজে স্থানীয় কয়েকজনের পাশাপাশি একটি কম্পিউটার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও পাসপোর্ট অফিসের দালালচক্রের সম্পৃক্ততার অভিযোগও পাওয়া গেছে।

নড়াইল শহরের ইউনাইটেড কম্পিউটারের স্বত্বাধিকারী কৌশিক দাস রায় এ প্রক্রিয়ার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। তার দাবি, তার এক আত্মীয় শিক্ষিকা মিঠু রাণী ভদ্রও জন্মনিবন্ধন তৈরির প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবগত ছিলেন।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে জন্মনিবন্ধন তৈরির প্রক্রিয়া নিয়ে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, সমাপ্তীর স্থায়ী ঠিকানা শেখহাটি ইউনিয়নে হলেও তার নামে ডিজিটাল জন্মনিবন্ধন করা হয়েছে বাওইসোনা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে।

এ ঘটনায় বাওইসোনা ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোক্তা নাঈম হোসেন ও সচিব মান্নানের বিরুদ্ধে যোগসাজশের অভিযোগ উঠেছে। তাদের সহযোগিতায় জাল তথ্য ব্যবহার করে জন্মনিবন্ধন তৈরি করা হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

অভিযোগ রয়েছে, ওই নথিপত্রের ভিত্তিতে পরবর্তীতে সমাপ্তীকে ‘রুপসী রায়’ পরিচয়ে পাসপোর্টও তৈরি করা হয়েছে। এমনকি পাসপোর্টটি মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যদের হাতে পৌঁছে গেছে বলেও অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া গেছে।

এদিকে সমাপ্তীর পরিবার বলছে, মেয়েকে উদ্ধারে তারা দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করছে। খোঁজ না পেয়ে তার বাবা কালু বাড়ৈ রাজৈর থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে মেয়েকে অপহরণ করে মানবপাচারকারী চক্রের হাতে জিম্মি রাখার আশঙ্কার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

সমাপ্তীর বড় বোনের জামাই বলেন, ফেসবুকে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে ভারত থেকে আসা আবির নড়াইলের কয়েকজনের সহযোগিতায় সমাপ্তীকে নিয়ে গেছে বলে তারা জানতে পেরেছেন। তাকে ভারতে পাচারের চেষ্টা চলছে বলেও তাদের আশঙ্কা। মেয়েটিকে উদ্ধারে পুলিশ ও সাংবাদিকদের সহযোগিতা চান তারা।

রাজৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ আমিনুল ইসলাম অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। দ্রুত মানবপাচারকারী চক্রের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই সজিব বলেন, তিনি সমাপ্তীর বাড়িতে গিয়ে ঘটনার সত্যতা যাচাই করেছেন। তবে ভুক্তভোগী অন্য জেলায় থাকায় এবং তার সুনির্দিষ্ট অবস্থান নিশ্চিত না হওয়ায় তদন্তে কিছুটা সময় লাগছে। দ্রুত অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনা হবে।

নড়াইলের সাংবাদিক ও রুর‍্যাল জার্নালিস্ট ফাউন্ডেশনের (আরজেএফ) সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মো. সাজ্জাদ আলম খান সজল বলেন, একটি সাংবাদিক দল দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি অনুসন্ধান করছে। তাদের হাতে সমাপ্তীর পরিচয় পরিবর্তন, নথিপত্র তৈরি ও পাসপোর্ট করার বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ এসেছে বলে দাবি করেন তিনি।

তার ভাষ্য, ১৪ বছরের একটি কিশোরীর পরিচয় বদলে অন্য জেলার ঠিকানায় জন্মনিবন্ধন ও পাসপোর্ট তৈরি করা সাধারণ প্রক্রিয়ায় সম্ভব নয়। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা তদন্ত করে বের করা জরুরি।

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা কি না, নাকি নড়াইলে সক্রিয় একটি বড় মানবপাচার চক্রের অংশ—তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরকারি নথি তৈরির সঙ্গে জড়িতদের ভূমিকা যাচাই এবং নিখোঁজ কিশোরীকে দ্রুত উদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন তারা।

তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে অভিযুক্ত বাওইসোনা ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোক্তা নাঈম হোসেন, সচিব মান্নান, মিঠু রাণী ভদ্র, সুব্রত রায় ও বাপ্পি রায় ওরফে আবিরের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে তা যুক্ত করা হবে।