ঢাকা ০৩:২১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
‘কোয়ার্টজ পাউডার’ ঘোষণায় আমদানি

বেনাপোলে বিপুল পরিমাণ ভায়াগ্রার কাঁচামাল জব্দ

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট সময় : ১০:৪১:৫৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬
  • / ৪২ বার পঠিত

দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলে ‘কোয়ার্টজ পাউডার’ ঘোষণা দিয়ে ভারত থেকে আমদানি করা একটি চালানে বিপুল পরিমাণ ভায়াগ্রার কাঁচামালসহ বিভিন্ন নিয়ন্ত্রিত ওষুধ তৈরির উপাদান জব্দ করেছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। উচ্চমূল্যের এসব পণ্য অবৈধভাবে সরিয়ে নেওয়ার আশঙ্কায় সংশ্লিষ্ট পণ্যগারকে ২৪ ঘণ্টার বিশেষ নিরাপত্তা বলয়ের আওতায় আনা হয়েছে।

কাস্টমস সূত্র জানায়, গত ১৫ মার্চ ঢাকার কামরাঙ্গীরচরের মেসার্স আরাফাত এন্টারপ্রাইজ ভারত থেকে প্রায় ১৬ টন পণ্য আমদানি করে। আমদানি নথিতে পণ্যের নাম উল্লেখ করা হয় ‘কোয়ার্টজ পাউডার’। চালানটি খালাসের দায়িত্বে ছিল হায়দার অ্যান্ড সন্স নামের একটি সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বেনাপোল কাস্টমস হাউস চালানটির ওপর বিশেষ নজরদারি শুরু করে। পরে বন্দরের ৩২ নম্বর শেডে সংরক্ষিত চালানটি কায়িক পরীক্ষা এবং রাসায়নিক বিশ্লেষণের জন্য নমুনা পরীক্ষাগারে পাঠানো হলে ঘোষণাপত্রের সঙ্গে পণ্যের মিল পাওয়া যায়নি। পরীক্ষায় বিপুল পরিমাণ সিলডেনাফিল সাইট্রেট (ভায়াগ্রার কাঁচামাল) এবং বিভিন্ন জীবনরক্ষাকারী ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত নিয়ন্ত্রিত রাসায়নিকের উপস্থিতি ধরা পড়ে।

জব্দ হওয়া পণ্যের মধ্যে রয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৬৭৫ কেজি সিলডেনাফিল সাইট্রেট, ৮ হাজার ২০০ কেজি কোয়ার্টজ পাউডার, ২ হাজার ১৫০ কেজি ওমিপ্রাজল/এসোমিপ্রাজল ম্যাগনেসিয়াম ট্রাইহাইড্রেট, ৪৯৫ কেজি এটোরিকক্সিব, ৩৫০ কেজি সেফট্রিয়াক্সন সোডিয়াম, ১৮০ কেজি হাইড্রোকুইনোন, ১২০ কেজি ম্যাগনেসিয়াম স্টিয়ারেট, ১০০ কেজি রিবোফ্লাভিন সোডিয়াম ফসফেট, ১০০ কেজি ক্যাফেইন, ৫০ কেজি স্যালিসিলিক অ্যাসিড, ৪০ কেজি মন্টেলুকাস্ট সোডিয়াম এবং ২৫ কেজি ডমপেরিডন/প্যারাসিটামল।

বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সহকারী কমিশনার অটল গোস্বামী স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বলা হয়েছে, চালানটি নিয়ে আইনগত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আশঙ্কা করা হচ্ছে, একটি সংঘবদ্ধ চক্র কাস্টমসের নজর এড়িয়ে জব্দকৃত পণ্য সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট শেডে অতিরিক্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বন্দর কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা হয়েছে।

এর পর থেকেই ৩২ নম্বর শেডে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বর্তমানে আনসার সদস্য, বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মী এবং বন্দরের নিজস্ব গোয়েন্দা ইউনিট পালাক্রমে ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করছে। একই সঙ্গে বন্দরের আরেকটি শেডে দীর্ঘদিন ধরে জব্দ থাকা আরেকটি ভায়াগ্রার কাঁচামাল সন্দেহভাজন চালানের নিরাপত্তাও বাড়ানো হয়েছে।

বন্দর-সংশ্লিষ্টরা জানান, আধুনিক স্ক্যানিং ব্যবস্থা চালু থাকলেও কিছু অসাধু আমদানিকারক ও তাদের সহযোগীরা এখনও মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে নিয়ন্ত্রিত ও উচ্চমূল্যের পণ্য দেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করছে। সম্প্রতি প্রায় ১৫ কোটি টাকার আমদানি পণ্য পাচারের অভিযোগে কাস্টমস কর্মকর্তা, বন্দর-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, নিরাপত্তাকর্মী, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও আমদানিকারকসহ ৫৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার পর নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কঠোর করা হয়েছে।

এর আগে ২০১৯ সালের ২৬ মে সোডিয়াম গ্লাইকুলেট ঘোষণা দিয়ে ভারত থেকে আনা একটি চালান পরীক্ষার পর ভায়াগ্রার কাঁচামাল হিসেবে শনাক্ত হয়েছিল। সেই চালানটিও এখনও বন্দরের ৩৪ নম্বর শেডে জব্দ অবস্থায় রয়েছে।

বেনাপোল আমদানি-রপ্তানি সমিতির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান বলেন, এ ধরনের নিয়ন্ত্রিত ওষুধের কাঁচামাল অবৈধভাবে বাজারে ছড়িয়ে পড়লে তা জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই মূল হোতাদের পাশাপাশি এ কাজে সহযোগিতাকারীদেরও আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।

স্থানীয় ব্যবসায়ী রহমত আলী বলেন, অসাধু কিছু ব্যবসায়ীর কারণে সৎ আমদানিকারকদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এতে অনেক ব্যবসায়ী বেনাপোল বন্দর ব্যবহার থেকে নিরুৎসাহিত হয়ে বিকল্প বন্দর বেছে নিচ্ছেন।

বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক (ট্রাফিক) শামিম হোসেন বলেন, কাস্টমসের অনুরোধ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট শেডে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। জব্দকৃত চালানগুলোতে ২৪ ঘণ্টা নজরদারি চলছে এবং কোনো অবস্থাতেই নিরাপত্তায় শিথিলতা রাখা হবে না।

ট্যাগস :

‘কোয়ার্টজ পাউডার’ ঘোষণায় আমদানি

বেনাপোলে বিপুল পরিমাণ ভায়াগ্রার কাঁচামাল জব্দ

আপডেট সময় : ১০:৪১:৫৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলে ‘কোয়ার্টজ পাউডার’ ঘোষণা দিয়ে ভারত থেকে আমদানি করা একটি চালানে বিপুল পরিমাণ ভায়াগ্রার কাঁচামালসহ বিভিন্ন নিয়ন্ত্রিত ওষুধ তৈরির উপাদান জব্দ করেছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। উচ্চমূল্যের এসব পণ্য অবৈধভাবে সরিয়ে নেওয়ার আশঙ্কায় সংশ্লিষ্ট পণ্যগারকে ২৪ ঘণ্টার বিশেষ নিরাপত্তা বলয়ের আওতায় আনা হয়েছে।

কাস্টমস সূত্র জানায়, গত ১৫ মার্চ ঢাকার কামরাঙ্গীরচরের মেসার্স আরাফাত এন্টারপ্রাইজ ভারত থেকে প্রায় ১৬ টন পণ্য আমদানি করে। আমদানি নথিতে পণ্যের নাম উল্লেখ করা হয় ‘কোয়ার্টজ পাউডার’। চালানটি খালাসের দায়িত্বে ছিল হায়দার অ্যান্ড সন্স নামের একটি সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বেনাপোল কাস্টমস হাউস চালানটির ওপর বিশেষ নজরদারি শুরু করে। পরে বন্দরের ৩২ নম্বর শেডে সংরক্ষিত চালানটি কায়িক পরীক্ষা এবং রাসায়নিক বিশ্লেষণের জন্য নমুনা পরীক্ষাগারে পাঠানো হলে ঘোষণাপত্রের সঙ্গে পণ্যের মিল পাওয়া যায়নি। পরীক্ষায় বিপুল পরিমাণ সিলডেনাফিল সাইট্রেট (ভায়াগ্রার কাঁচামাল) এবং বিভিন্ন জীবনরক্ষাকারী ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত নিয়ন্ত্রিত রাসায়নিকের উপস্থিতি ধরা পড়ে।

জব্দ হওয়া পণ্যের মধ্যে রয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৬৭৫ কেজি সিলডেনাফিল সাইট্রেট, ৮ হাজার ২০০ কেজি কোয়ার্টজ পাউডার, ২ হাজার ১৫০ কেজি ওমিপ্রাজল/এসোমিপ্রাজল ম্যাগনেসিয়াম ট্রাইহাইড্রেট, ৪৯৫ কেজি এটোরিকক্সিব, ৩৫০ কেজি সেফট্রিয়াক্সন সোডিয়াম, ১৮০ কেজি হাইড্রোকুইনোন, ১২০ কেজি ম্যাগনেসিয়াম স্টিয়ারেট, ১০০ কেজি রিবোফ্লাভিন সোডিয়াম ফসফেট, ১০০ কেজি ক্যাফেইন, ৫০ কেজি স্যালিসিলিক অ্যাসিড, ৪০ কেজি মন্টেলুকাস্ট সোডিয়াম এবং ২৫ কেজি ডমপেরিডন/প্যারাসিটামল।

বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সহকারী কমিশনার অটল গোস্বামী স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বলা হয়েছে, চালানটি নিয়ে আইনগত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আশঙ্কা করা হচ্ছে, একটি সংঘবদ্ধ চক্র কাস্টমসের নজর এড়িয়ে জব্দকৃত পণ্য সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট শেডে অতিরিক্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বন্দর কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা হয়েছে।

এর পর থেকেই ৩২ নম্বর শেডে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বর্তমানে আনসার সদস্য, বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মী এবং বন্দরের নিজস্ব গোয়েন্দা ইউনিট পালাক্রমে ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করছে। একই সঙ্গে বন্দরের আরেকটি শেডে দীর্ঘদিন ধরে জব্দ থাকা আরেকটি ভায়াগ্রার কাঁচামাল সন্দেহভাজন চালানের নিরাপত্তাও বাড়ানো হয়েছে।

বন্দর-সংশ্লিষ্টরা জানান, আধুনিক স্ক্যানিং ব্যবস্থা চালু থাকলেও কিছু অসাধু আমদানিকারক ও তাদের সহযোগীরা এখনও মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে নিয়ন্ত্রিত ও উচ্চমূল্যের পণ্য দেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করছে। সম্প্রতি প্রায় ১৫ কোটি টাকার আমদানি পণ্য পাচারের অভিযোগে কাস্টমস কর্মকর্তা, বন্দর-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, নিরাপত্তাকর্মী, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও আমদানিকারকসহ ৫৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার পর নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কঠোর করা হয়েছে।

এর আগে ২০১৯ সালের ২৬ মে সোডিয়াম গ্লাইকুলেট ঘোষণা দিয়ে ভারত থেকে আনা একটি চালান পরীক্ষার পর ভায়াগ্রার কাঁচামাল হিসেবে শনাক্ত হয়েছিল। সেই চালানটিও এখনও বন্দরের ৩৪ নম্বর শেডে জব্দ অবস্থায় রয়েছে।

বেনাপোল আমদানি-রপ্তানি সমিতির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান বলেন, এ ধরনের নিয়ন্ত্রিত ওষুধের কাঁচামাল অবৈধভাবে বাজারে ছড়িয়ে পড়লে তা জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই মূল হোতাদের পাশাপাশি এ কাজে সহযোগিতাকারীদেরও আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।

স্থানীয় ব্যবসায়ী রহমত আলী বলেন, অসাধু কিছু ব্যবসায়ীর কারণে সৎ আমদানিকারকদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এতে অনেক ব্যবসায়ী বেনাপোল বন্দর ব্যবহার থেকে নিরুৎসাহিত হয়ে বিকল্প বন্দর বেছে নিচ্ছেন।

বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক (ট্রাফিক) শামিম হোসেন বলেন, কাস্টমসের অনুরোধ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট শেডে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। জব্দকৃত চালানগুলোতে ২৪ ঘণ্টা নজরদারি চলছে এবং কোনো অবস্থাতেই নিরাপত্তায় শিথিলতা রাখা হবে না।