ঢাকা ১১:২৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬, ১৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ডুমুরিয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী ঘোড়ার গাড়ি

শেখ মাহতাব হোসেন
  • আপডেট সময় : ০৯:০০:৪৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬
  • / ৫৭ বার পঠিত

আধুনিক ও যান্ত্রিক যানবাহনের দাপটে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলা থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে একসময়কার জনপ্রিয় ও ঐতিহ্যবাহী ঘোড়ার গাড়ি। একসময় গ্রামীণ জনপদে যাতায়াত, কৃষিপণ্য পরিবহন এবং জীবিকার প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত এই বাহন এখন বিলুপ্তির পথে। উপজেলার দু-একটি এলাকায় মাঝে মধ্যে ঘোড়ার গাড়ির দেখা মিললেও তা এখন শুধুই অতীতের ঐতিহ্যের স্মারক।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রাচীনকাল থেকে যুদ্ধক্ষেত্র, রাজকীয় যাতায়াত এবং পরবর্তী সময়ে গ্রামীণ জনজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে ঘোড়ার গাড়ি। মাঠ থেকে ধান, পাট ও সবজি ঘরে আনা কিংবা হাট-বাজারে কৃষিপণ্য পরিবহনে এই বাহনের ব্যাপক ব্যবহার ছিল। একসময় উপজেলার অনেক পরিবার ঘোড়ার গাড়ি চালিয়েই জীবিকা নির্বাহ করতেন এবং আর্থিকভাবে স্বচ্ছল ছিলেন।

কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ইঞ্জিনচালিত নসিমন, করিমন, ইজিবাইক ও থ্রি-হুইলারের সহজলভ্যতা ঘোড়ার গাড়ির চাহিদা প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছে। একই সঙ্গে ঘোড়া পালনের ব্যয়ও বেড়েছে কয়েকগুণ। চারণভূমি কমে যাওয়া এবং পর্যাপ্ত ঘাসের অভাব ঘোড়া পালনকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

উপজেলার আরাজি সাজিয়াড়া গ্রামের ঘোড়ার গাড়িচালক মো. লতিফ শেখ ও হাফিজুর রহমান শেখ জানান, বাপ-দাদার আমল থেকে তারা এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। একসময় ঘোড়ার গাড়ি চালিয়ে সংসার ভালোভাবেই চলত। মাঠের ধান, পাট ও সবজি হাটে পৌঁছে দিতেন তারা। কিন্তু এখন পাকা রাস্তা ও ইঞ্জিনচালিত যানবাহনের কারণে তাদের আর কেউ ডাকে না। অন্যদিকে ঘোড়ার খাবারের দাম বেড়েছে, আগের মতো ঘাসও পাওয়া যায় না। ফলে ঘোড়া বাঁচিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে অনেকেই এ পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন।

ডুমুরিয়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ড. মো. আশরাফুল কবির বলেন, ঘোড়ার গাড়ি এ অঞ্চলের একটি প্রাচীন ঐতিহ্য। তবে নগরায়ণ ও যান্ত্রিকীকরণের কারণে এর ব্যবহার ক্রমেই কমে যাচ্ছে। বর্তমানে উপজেলায় হাতে গোনা কয়েকটি ঘোড়ার গাড়ি রয়েছে। প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পক্ষ থেকে এসব ঘোড়ার চিকিৎসা ও টিকাদান কার্যক্রম নিয়মিত পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি কোনো মালিক ঘোড়া পালনে সমস্যায় পড়লে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তাও দেওয়া হবে।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, কালের বিবর্তনে গ্রামীণ ঐতিহ্যের অনেক কিছুই হারিয়ে যাচ্ছে, ঘোড়ার গাড়ি তার অন্যতম। যান্ত্রিক পরিবহনের যুগে এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব কমলেও পর্যটন কিংবা বিশেষ উৎসব-পার্বণে ঘোড়ার গাড়ির আলাদা আবেদন রয়েছে। এ ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে ঘোড়া পালনকারীদের সরকারি প্রণোদনা ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার আওতায় আনার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিজ সবিতা সরকার বলেন, ঘোড়ার গাড়ি আবহমান বাংলার সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। ডুমুরিয়া থেকেও এটি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে, যা সত্যিই বেদনাদায়ক। যারা এখনো এই পেশা ধরে রেখেছেন, তাদের জীবনমান উন্নয়ন, বিকল্প কর্মসংস্থান এবং পেশাটি টিকিয়ে রাখার বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে কার্যকর পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে আগামী প্রজন্মের কাছে ঘোড়ার গাড়ি শুধুই ইতিহাসের পাতায় কিংবা পুরোনো আলোকচিত্রে সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে। তাই গ্রামীণ ঐতিহ্যের এই অনন্য বাহন সংরক্ষণে এখনই সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

ডুমুরিয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী ঘোড়ার গাড়ি

আপডেট সময় : ০৯:০০:৪৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬

আধুনিক ও যান্ত্রিক যানবাহনের দাপটে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলা থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে একসময়কার জনপ্রিয় ও ঐতিহ্যবাহী ঘোড়ার গাড়ি। একসময় গ্রামীণ জনপদে যাতায়াত, কৃষিপণ্য পরিবহন এবং জীবিকার প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত এই বাহন এখন বিলুপ্তির পথে। উপজেলার দু-একটি এলাকায় মাঝে মধ্যে ঘোড়ার গাড়ির দেখা মিললেও তা এখন শুধুই অতীতের ঐতিহ্যের স্মারক।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রাচীনকাল থেকে যুদ্ধক্ষেত্র, রাজকীয় যাতায়াত এবং পরবর্তী সময়ে গ্রামীণ জনজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে ঘোড়ার গাড়ি। মাঠ থেকে ধান, পাট ও সবজি ঘরে আনা কিংবা হাট-বাজারে কৃষিপণ্য পরিবহনে এই বাহনের ব্যাপক ব্যবহার ছিল। একসময় উপজেলার অনেক পরিবার ঘোড়ার গাড়ি চালিয়েই জীবিকা নির্বাহ করতেন এবং আর্থিকভাবে স্বচ্ছল ছিলেন।

কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ইঞ্জিনচালিত নসিমন, করিমন, ইজিবাইক ও থ্রি-হুইলারের সহজলভ্যতা ঘোড়ার গাড়ির চাহিদা প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছে। একই সঙ্গে ঘোড়া পালনের ব্যয়ও বেড়েছে কয়েকগুণ। চারণভূমি কমে যাওয়া এবং পর্যাপ্ত ঘাসের অভাব ঘোড়া পালনকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

উপজেলার আরাজি সাজিয়াড়া গ্রামের ঘোড়ার গাড়িচালক মো. লতিফ শেখ ও হাফিজুর রহমান শেখ জানান, বাপ-দাদার আমল থেকে তারা এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। একসময় ঘোড়ার গাড়ি চালিয়ে সংসার ভালোভাবেই চলত। মাঠের ধান, পাট ও সবজি হাটে পৌঁছে দিতেন তারা। কিন্তু এখন পাকা রাস্তা ও ইঞ্জিনচালিত যানবাহনের কারণে তাদের আর কেউ ডাকে না। অন্যদিকে ঘোড়ার খাবারের দাম বেড়েছে, আগের মতো ঘাসও পাওয়া যায় না। ফলে ঘোড়া বাঁচিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে অনেকেই এ পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন।

ডুমুরিয়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ড. মো. আশরাফুল কবির বলেন, ঘোড়ার গাড়ি এ অঞ্চলের একটি প্রাচীন ঐতিহ্য। তবে নগরায়ণ ও যান্ত্রিকীকরণের কারণে এর ব্যবহার ক্রমেই কমে যাচ্ছে। বর্তমানে উপজেলায় হাতে গোনা কয়েকটি ঘোড়ার গাড়ি রয়েছে। প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পক্ষ থেকে এসব ঘোড়ার চিকিৎসা ও টিকাদান কার্যক্রম নিয়মিত পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি কোনো মালিক ঘোড়া পালনে সমস্যায় পড়লে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তাও দেওয়া হবে।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, কালের বিবর্তনে গ্রামীণ ঐতিহ্যের অনেক কিছুই হারিয়ে যাচ্ছে, ঘোড়ার গাড়ি তার অন্যতম। যান্ত্রিক পরিবহনের যুগে এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব কমলেও পর্যটন কিংবা বিশেষ উৎসব-পার্বণে ঘোড়ার গাড়ির আলাদা আবেদন রয়েছে। এ ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে ঘোড়া পালনকারীদের সরকারি প্রণোদনা ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার আওতায় আনার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিজ সবিতা সরকার বলেন, ঘোড়ার গাড়ি আবহমান বাংলার সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। ডুমুরিয়া থেকেও এটি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে, যা সত্যিই বেদনাদায়ক। যারা এখনো এই পেশা ধরে রেখেছেন, তাদের জীবনমান উন্নয়ন, বিকল্প কর্মসংস্থান এবং পেশাটি টিকিয়ে রাখার বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে কার্যকর পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে আগামী প্রজন্মের কাছে ঘোড়ার গাড়ি শুধুই ইতিহাসের পাতায় কিংবা পুরোনো আলোকচিত্রে সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে। তাই গ্রামীণ ঐতিহ্যের এই অনন্য বাহন সংরক্ষণে এখনই সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।