
ষাটের দশকের গণআন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, বর্ষীয়ান আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। সোমবার (১ জুন) বিকেল সাড়ে ৩টায় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।
তোফায়েল আহমেদের জামাতা ডা. তৌহিদুজ্জামান তুহিন তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসাধীন থাকার পর সোমবার বিকেলে হাসপাতালে তিনি মারা যান।
স্কয়ার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, নিউমোনিয়াজনিত শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ ও বার্ধক্যজনিত শারীরিক দুর্বলতা নিয়ে গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর হাসপাতালে ভর্তি হন তোফায়েল আহমেদ। আইসিইউ সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. রায়হান রাব্বানীর নিবিড় তত্ত্বাবধানে তার চিকিৎসা চলছিল। চিকিৎসকদের দীর্ঘদিনের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
তোফায়েল আহমেদ দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। তিনি এক মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী, রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ও শুভানুধ্যায়ী রেখে গেছেন। এর আগে গত বছরের ২০ নভেম্বর তার স্ত্রী আনোয়ারা আহমেদ মারা যান। তাদের একমাত্র সন্তান তাসলিমা আহমেদ জামান মুন্নী একজন চিকিৎসক।
১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তোফায়েল আহমেদ। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। ছাত্রলীগের রাজনীতির মাধ্যমে তার রাজনৈতিক পথচলা শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ১৯৬৬-৬৭ মেয়াদে ইকবাল হলের (বর্তমানে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) নির্বাচিত ভিপি ছিলেন তিনি।
১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)-এর ভিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তোফায়েল আহমেদ। ১৯৬৮-৬৯ সালের গণআন্দোলন ও ছাত্র আন্দোলনে তিনি সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে তার সাহসী ও বলিষ্ঠ নেতৃত্ব তাকে জাতীয় রাজনীতিতে বিশেষ পরিচিতি এনে দেয়। ওই আন্দোলনের মুখেই তৎকালীন পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবুর রহমানসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সব আসামিকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।
১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লাখো জনতার উপস্থিতিতে আয়োজিত এক ঐতিহাসিক সমাবেশে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করার ঘোষণা দেন তোফায়েল আহমেদ। এ ঘটনাটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
পরবর্তীতে ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে মাত্র ২৭ বছর বয়সে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পাশাপাশি একাধিকবার মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন।
রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন সময়ে, বিশেষ করে ১৯৭৫-পরবর্তী সময়ে, বহুবার কারাবরণ করেন এ প্রবীণ রাজনীতিক। গণতান্ত্রিক আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও জাতীয় রাজনীতিতে তার অবদান দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

























